অসুস্থ হয়েও অফিস ছুটি নিতে কেন অপরাধবোধ কাজ করে? জানাল গবেষণা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শরীর অসুস্থ, অথচ সামনে কাজের বড় এক চাপ—এমন পরিস্থিতিতে কী করেন আপনি? যদি উত্তর হয় কাজে যাওয়া তবে বলে রাখা ভালো যে আপনি একা নন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রতি তিনজন থেকে অর্ধেক মানুষই অসুস্থ অবস্থায় কাজ চালিয়ে যান, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন ‘প্রেজেন্টিজম’।
অবাক করার বিষয় হলো, অসুস্থতার প্রতি মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক কিছু প্রকাশ করে দেয়—একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনি কেমন এবং যেখানে কাজ করেন সেই কর্মপরিবেশটি কেমন।
তরুণরা কেন কম ছুটি নেন?
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কর্মক্ষেত্র কল্যাণ বিশেষজ্ঞ ও ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্যার ক্যারি কুপার বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে প্রায়ই ‘স্নোফ্লেক’ বা অতি সংবেদনশীল তকমা দেওয়া হলেও তা সত্যি নয়।’
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যও এই ধারণাটিকেই সমর্থন করে। গত বছর দেশটিতে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সি কর্মীরা গড়ে মাত্র ২.৪ দিন অসুস্থতাজনিত ছুটি নিয়েছেন, যেখানে ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই গড় ছিল ৬.২ দিন।
স্যার কুপার জানান, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তরুণ কর্মীরা প্রায়ই জিরো-আওয়ার কন্ট্রাক্টের মতো এমন সব পেশায় কাজ করেন যেখানে চাকরির নিরাপত্তা বেশ কম। এ ছাড়া তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার মতো সমস্যাও কম থাকে, যা অসুস্থতার কারণে ছুটি নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় নিয়োগকর্তারা কীভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করবেন এবং তাদের কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনা করবেন, সে বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বয়স্ক প্রজন্ম হয়তো পরিস্থিতি মেনে নিতে বেশি অভ্যস্ত ছিল, তবে তার মানে এই নয় যে সেই দৃষ্টিভঙ্গিটি স্বাস্থ্যকর।’
বর্তমানে ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ কর্মীরা মানসিক স্বাস্থ্যকে তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি অংশ হিসেবে দেখতে চায়।
ছুটির সিদ্ধান্ত আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কী বলে?
অসুস্থতা নিয়ে ছুটি না নেওয়ার পেছনে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে। অনেক মানুষের কাছে তাদের কাজ আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পেশাগত মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ওয়ার্ক সেন্ট্রালিটি’।
গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কাজের প্রতি অধিক সম্পৃক্ততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। কাজ যাদের কাছে তাদের পরিচয়ের মূল অংশ, তাদের কাছে অফিসে অনুপস্থিত থাকা মানে নিজের একটি অংশ সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলার মতো।
মনোবিজ্ঞানী ড. অড্রে ট্যাং এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই ধরনের মানুষের মধ্যে সবসময় উপস্থিত থাকার প্রবল তাগিদ কাজ করে।’ তিনি জানান, শিক্ষকতা, চিকিৎসা বা নার্সিংয়ের মতো পরিচর্যামূলক পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
অন্যদিকে, অনেকেই দুর্বল বা অলস হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার ভয়ে অসুস্থতা সত্ত্বেও কাজে যোগ দেন। তরুণ কর্মীরা তাদের পেশাজীবনের শুরুতে থাকায় নেতিবাচক ছাপ ফেলতে চান না, তাই তারা এই ঝুঁকিতে বেশি পড়েন।
আপনার অফিস সম্পর্কে এটি কী প্রকাশ করে?
মনোবিজ্ঞানী ড. তারা কুইন-সিরিলো বলেন, কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি এবং আচরণ মানুষের অসুস্থতাজনিত ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। যখন কোনো টিমে জনবল কম থাকে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকে, তখন কর্মীরা জানেন যে তাদের অনুপস্থিতি সহকর্মীদের কাজের চাপ বাড়িয়ে দেবে।
কুইন-সিরিলো বলেন, ‘যেসব ‘টক্সিক’ অফিসে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও কল্যাণের চেয়ে কাজকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেখানে অপরাধবোধ এবং লজ্জার ভূমিকা অত্যন্ত বেশি।’ কিছু অফিসে এমন একটি ‘চালিয়ে যাওয়া’ সংস্কৃতি থাকে যা কর্মীদের বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
তাই সুস্থ কর্মপরিবেশে কর্মীদের কল্যাণ ও অসুস্থতার দিনগুলো নিয়ে খোলামেলা ও সৎ আলোচনা করার সুযোগ থাকা উচিত। এ ছাড়া পারস্পরিক বিশ্বাসও একটি বড় বিষয়।
যদি কর্মীদের অনুপস্থিতি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা হয় বা সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, তবে বিচার বা অনুমানের ভয়ে কর্মীরা বৈধ ছুটি নেওয়া থেকেও বিরত থাকেন। এটিকে একটি ‘বিপদসংকেত’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কখন বুঝবেন আপনি কাজ করার জন্য বেশি অসুস্থ?
কাজে যোগ দেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা আছে কিনা, তা নির্ধারণ করা সবসময় সহজ নয়। শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে ড. ট্যাং কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
আপনার যদি বমি ও ডায়রিয়া থাকে অথবা জ্বর হয়, তবে লক্ষণগুলো পুরোপুরি ভালো হওয়ার পর যথাক্রমে ৪৮ ঘণ্টা ও ২৪ ঘণ্টা বাড়িতে থাকা উচিত। এই পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
কাশি বা সর্দির মতো সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। তবে ড. ট্যাং জোর দিয়ে বলেন, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আপনি যদি অসুস্থ থাকেন এবং কাজ করার মতো মানসিক বা শারীরিক ক্ষমতা না থাকে, তবে সেটাই বাস্তবিক হিসেবে মেনে নিতে হবে।
কুইন-সিরিলো যোগ করেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ বা অসুস্থতা যখন মানুষের নিজের যত্ন নেওয়ার মৌলিক ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে শুরু করে, ঘুম নষ্ট হয় বা কাজ থেকে মন শান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে—তখন বুঝে নিতে হবে যে, বিশ্রামের বিকল্প নেই।

