আপনার বাসা ভূমিকম্প সহনশীল কিনা, বুঝবেন কীভাবে?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা নিজের বাসা। কিন্তু সেই বাসাটিই যদি ভূমিকম্প সহনশীল না হয়, তাহলে তা হয়ে উঠতে পারে বড় বিপদের কারণ। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নির্মাণবিধি না মানা এবং ভবনের কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কিন্তু আপনার বাসাটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা কি নিজেই বোঝা সম্ভব? কিছু লক্ষণ প্রাথমিকভাবে ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে শুধু চোখে দেখে কোনো ভবনকে নিরাপদ বা অনিরাপদ ঘোষণা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মূল্যায়ন।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
১. দেওয়ালে বড় বা তির্যক ফাটল
দেওয়ালে তির্যক ফাটল, বিশেষ করে দরজা-জানালার কোণে ফাটল, কিংবা ফাটল ক্রমশ বড় হওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে প্লাস্টারের ফাটল আর কাঠামোগত ফাটল এক নয়। বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি।

২. পিলার বা বিমে ফাটল ও কংক্রিট খসে পড়া
পিলারে গভীর ফাটল, কংক্রিট খসে রড বেরিয়ে আসা, রডে মরিচা কিংবা বিমের সংযোগস্থলে ক্ষতি—এসব কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ হতে পারে। এগুলো কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
৩. নিচতলায় অতিরিক্ত খোলা জায়গা
ভবনের নিচতলা যদি পার্কিং বা দোকানের জন্য অনেকটা খোলা রাখা হয় এবং ওপরের তলায় দেয়াল বেশি থাকে, তাহলে সেটি সফট স্টোরি বা দুর্বল তলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী নির্মিত হলে এ ধরনের ভবনও নিরাপদ হতে পারে।

৪. ভবন হেলে পড়া বা দৃশ্যমান বিকৃতি
ভবন হেলে পড়া, মেঝে অস্বাভাবিকভাবে বসে যাওয়া কিংবা কাঠামোর দৃশ্যমান বিকৃতি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এমন কিছু দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. নকশাবহির্ভূত পরিবর্তন
অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত ভবনে পরে পিলার, বিম বা ভারবহনকারী দেয়ালে পরিবর্তন আনা হলে কাঠামোগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। ভবনের ওপর অতিরিক্ত তলা নির্মাণও প্রকৌশলগত যাচাই ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু ফাটল দেখেই কি বোঝা সম্ভব?
না। দেয়ালে ফাটল থাকলেই ভবন ভূমিকম্পে ধসে পড়বে, এমন নয়। আবার বাইরে থেকে কোনো ফাটল না থাকলেও ভবনের ভেতরে বা ভিত্তিতে কাঠামোগত দুর্বলতা থাকতে পারে।
ভবনের প্রকৃত ভূমিকম্প সহনশীলতা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর:
ভবনের নকশা: প্রযোজ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
নির্মাণের মান: কংক্রিট, রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান এবং নির্মাণকাজের যথাযথ তদারকি।
মাটির বৈশিষ্ট্য: ভবনের নিচের মাটির ধারণক্ষমতা, মাটির ধরন ও ভূমিকম্পের সময় সম্ভাব্য আচরণ।
কাঠামোগত ব্যবস্থা: পিলার, বিম, শিয়ার ওয়াল, সংযোগস্থল ও ভিত্তির নকশা।
পরবর্তী পরিবর্তন: ভবন নির্মাণের পর কাঠামোয় কোনো অননুমোদিত পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না।
আপনার বাসার নিরাপত্তা যাচাই করবেন কীভাবে?
১. ভবনের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করুন।
২. ভবনটি নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করুন।
৩. অভিজ্ঞ ও যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন করান। প্রয়োজনে কংক্রিট পরীক্ষা, রড শনাক্তকরণ, মাটির পরীক্ষা ও অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ভবনে নতুন ফাটল, পিলারের ক্ষতি বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
জরুরি সতর্কতা
ভূমিকম্পের পর ভবনে নতুন করে বড় ফাটল, পিলার বা বিমের ক্ষতি, কংক্রিট খসে পড়া কিংবা ভবন হেলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেলে নিরাপদে বেরিয়ে আসুন। ভবনটি পরীক্ষা না করা পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ করবেন না। গ্যাসের গন্ধ পেলে আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার করবেন না এবং সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন।
বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নই চূড়ান্ত
ভবনের বয়স বেশি হলেই সেটি অনিরাপদ, কিংবা নতুন ভবন মানেই ভূমিকম্প সহনশীল—এমন ধারণা সঠিক নয়। একটি ভবনের নিরাপত্তা নির্ভর করে তার নকশা, নির্মাণমান, মাটির অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঠামোগত সক্ষমতার ওপর।
তাই দৃশ্যমান লক্ষণগুলোকে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ভবন ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা নিশ্চিত হতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে পেশাদার মূল্যায়ন করানোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
