ঘুমের সময় আলো নাকি তাপমাত্রা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? যা বলছে গবেষণা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘুমের গভীরতা থেকে শুরু করে সকালে সতেজ বোধ করা-সবকিছুর ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে ঘরের তাপমাত্রা। এমনকি কখন ঘুম আসবে, তা নির্ধারণেও তাপমাত্রা আলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাতে ঘুমানোর আগে ঘরের জানালা খুলে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে দেওয়া অনেকের অভ্যাস। যুক্তরাষ্ট্রের নৃবিজ্ঞানী গান্ধী ইয়েতিশেরও ছোটবেলায় এমন অভ্যাস ছিল। নিউ জার্সিতে শীতের রাতে জানালা খুলে ঠান্ডা বাতাসে মুখ ভিজিয়ে নিতেন তিনি। এতে দ্রুত ঘুম পেত তার। তবে ঘরের হিটিং ব্যবস্থার খরচ বাড়বে কি না, তা নিয়ে মায়ের বকুনির ভয়ও ছিল।
একসময় ইয়েতিশ ভেবেছিলেন, ঠান্ডা ঘরে ঘুমানোর পছন্দটি হয়তো তার ব্যক্তিগত অভ্যাস। কিন্তু বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঘুম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য পান, যা ঘুমের সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘুমের সময় ও মান নির্ধারণে এত দিন পরিবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে আলোকে বিবেচনা করা হলেও, তাপমাত্রার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু গবেষক।
সূর্যাস্তের সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্ক
বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী তসিমানে জনগোষ্ঠীর ঘুমের ধরন নিয়ে গবেষণা করেন ইয়েতিশ। তিনি লক্ষ করেন, কৃত্রিম আলোর ব্যবহার না থাকলেও তাদের ঘুমের সময় সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তারা সাধারণত সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান এবং সূর্য ওঠার আগেই জেগে ওঠেন।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে নিয়ে তানজানিয়ার হাডজা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সান জনগোষ্ঠীর ঘুমের ধরনও পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। সেখানেও ঘুমের সময়ের সঙ্গে আলো-অন্ধকারের চক্রের সরাসরি মিল সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। বরং পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়া-কমার সঙ্গে ঘুমের সময়ের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করেন গবেষকেরা।
ইয়েতিশের ভাষায়, সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার কারণ হিসেবে আমরা সাধারণত আলোর কথা ভাবি। কিন্তু তাপমাত্রার পরিবর্তনও সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঘুমের আগে শরীরের তাপমাত্রা কমে
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। রাতের বেশির ভাগ সময় এ তাপমাত্রা নিম্নমুখী থাকে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তুলনায় রাতে তা সাধারণত প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়।
বার্লিনের ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার অব স্লিপ মেডিসিনের ঘুমবিষয়ক চিকিৎসক ও গবেষক সেবাস্তিয়ান হারবার্গারের মতে, ঘর অতিরিক্ত গরম হলে ঘুমের সময় কমে যেতে পারে এবং বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
২০০৭ সালের একটি গবেষণায় ঘুমের সময় ঘরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রভাব পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। এক পরীক্ষায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে ঘরের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি থেকে কমিয়ে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস করা হয়। এরপর ভোর ৩টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে আবার ২৭ ডিগ্রিতে তোলা হয়। অন্য পরীক্ষায় সারা রাত ঘরের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমানো ও বাড়ানোর পরিবেশে ঘুমানো ব্যক্তিদের শরীরে রাতে মেলাটোনিন হরমোনের একটি সূচকের মাত্রা বেশি ছিল। ঘুমের আগে শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তিরা ঘুম থেকে উঠে তুলনামূলক বেশি সতেজ বোধ করেছেন।
গবেষকদের ধারণা, সন্ধ্যা ও ভোরে পরিবেশের স্বাভাবিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের গভীর ঘুমের প্রক্রিয়া বিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তবে ঘুমের জন্য ঠিক কতটা তাপমাত্রা হ্রাস প্রয়োজন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
শরীরের জৈবঘড়ি নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা আছে?
মানুষের শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি রয়েছে, যা ঘুম, জেগে থাকা, খাওয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক ও আচরণগত প্রক্রিয়ার সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ২৪ ঘণ্টার এই চক্রকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এত দিন এই জৈবঘড়ি নিয়ন্ত্রণের প্রধান পরিবেশগত সংকেত হিসেবে আলোকে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে তাপমাত্রাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কাডিয়ান নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক রাসেল ফস্টারের মতে, ঘুমের আগে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে জৈবঘড়ির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে তাপমাত্রার পরিবর্তনও ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিভিন্ন প্রাণীর ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু তাপমাত্রার ওঠানামার মাধ্যমেও ফলের মাছি থেকে উট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির জৈবঘড়ির ছন্দে পরিবর্তন আনা সম্ভব। মানুষের কোষের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির ওপরও কৃত্রিমভাবে তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রভাব পাওয়া গেছে। তবে প্রাণী ও কোষের ওপর চালানো পরীক্ষার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়।
১৯৭৪ সালের একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের সময় ঘরের তাপমাত্রা জেগে থাকার সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম রাখা হয়েছিল। এতে তাদের ঘুম ও জেগে থাকার চক্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ মিনিট বেড়ে যায়। গবেষকেরা তখন উল্লেখ করেন, মানুষের জৈবঘড়ি নিয়ন্ত্রণে তাপমাত্রার প্রভাব আলোর প্রভাবের কাছাকাছি হতে পারে।
২০০৭ সালের গবেষণাতেও তাপমাত্রার ওঠানামার সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া যায়। ঘরের তাপমাত্রা পরিবর্তনশীল রাখা হলে অংশগ্রহণকারীদের শরীরের তাপমাত্রা রাতের মধ্যে গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা আগে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রোনোবায়োলজিস্ট ক্রিশ্চিয়ান কাজোখেন মনে করেন, তাপমাত্রা মানুষের জৈবঘড়িকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। তাই আপাতত তাপমাত্রাকে আলোর বিকল্প প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

-6acbb996ee84c.jpg)
