পুরুষদের তুলনায় নারীরা কেন বেশি ব্যথা অনুভব করেন, জানাল গবেষণা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম
নারী-পুরুষের ব্যথা অনুভবের পার্থক্যের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের ১১৮টি দেশের ৬১ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথার কথা বেশি জানান। তবে শরীরের কোন স্থানে এবং কী ধরনের ব্যথা হচ্ছে, তার ওপর নারী-পুরুষের এই পার্থক্যের মাত্রা নির্ভর করে।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাটিতে শরীরের ১১টি অঞ্চলে ব্যথার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে মাথা, মুখ, ঘাড়, কাঁধ, হাত, কবজি, কনুই, পা, গোড়ালি, হাঁটু, বুক, পিঠ, পেট ও নিতম্ব। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পিঠের ব্যথা ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের এই সমস্যা ছিল।
কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং গবেষণাটির প্রধান লেখক ম্যাট ফিলিংহাম বলেন, নারী-পুরুষের ব্যথা অনুভবের পার্থক্যের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এর পেছনে জৈবিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
নারীরা কেন বেশি ব্যথা অনুভব করেন?
গবেষকদের মতে, নারী-পুরুষের হরমোনের পার্থক্য, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যক্রম, স্নায়ুতন্ত্রের ব্যথা প্রক্রিয়াকরণের ধরন, মানসিক চাপ, প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক পরিশ্রম এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগের মতো বিষয়গুলো ব্যথার তারতম্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া মানুষ কীভাবে ব্যথা শনাক্ত করেন, উপসর্গের বর্ণনা দেন এবং চিকিৎসকের কাছে তা জানান, তার পার্থক্যও গবেষণার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফিলিংহাম বলেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ ও নারীর শরীরে ব্যথা তৈরি হওয়া এবং সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে যাওয়ার জৈবিক প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। ব্যথার প্রতিক্রিয়ায় নারী ও পুরুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভিন্ন পথ ব্যবহার করতে পারে বলেও কিছু পরীক্ষায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটি মেডিকেল সেন্টারের ব্যথা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুচিতা গার্গ বলেন, নারীদের মধ্যে বেশি ব্যথার প্রবণতার পেছনে জৈবিক, হরমোনজনিত, মানসিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মুখমণ্ডল, পেট, মাথা এবং তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে পারে। মাইগ্রেন, চোয়ালের সন্ধির সমস্যা এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ থেকে উৎপন্ন ব্যথার মতো কিছু সমস্যায় নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। এসব সমস্যার সঙ্গে প্রজনন হরমোন এবং বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রজননকালীন শারীরিক পরিবর্তনেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
হরমোন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও প্রজননস্বাস্থ্যের প্রভাব
ব্যথার অনুভূতিতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও গবেষকেরা গুরুত্ব দিয়েছেন। কিছু গবেষণায় পুরুষের স্নায়ুজনিত ব্যথার সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে টি-সেল নামের রোগপ্রতিরোধী কোষের কার্যক্রমের ভূমিকার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এসব প্রমাণের বড় অংশই প্রাণীর ওপর প্রাথমিক গবেষণা থেকে পাওয়া। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে কাজ করে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যাও ব্যথার সামগ্রিক প্রবণতার পার্থক্যে ভূমিকা রাখতে পারে। বেদনাদায়ক মাসিক, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং শ্রোণি অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ফাইব্রোমায়ালজিয়া নামের একটি রোগ নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এ রোগে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ব্যথা এবং ব্যথার প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
মানসিক ও সামাজিক বিষয়গুলোও ব্যথার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক আঘাত, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব এবং রোগ শনাক্ত বা চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে ব্যথা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের সতর্কতা, নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যথার পার্থক্যের পেছনে একটিমাত্র সর্বজনীন কারণ নেই। বরং বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। শরীরের স্থান ও রোগের ধরন অনুযায়ী এসব কারণের প্রভাবও আলাদা হতে পারে।
২০ থেকে ৫৫ বছর বয়সে দ্রুত বাড়ে পেশি ও হাড়ের ব্যথা
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ২০ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে পেশি ও হাড়সংক্রান্ত ব্যথার হার সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এই বয়সের মানুষের মধ্যেই ব্যথার সামগ্রিক হার সবচেয়ে বেশি। বরং এই বয়সসীমায় ব্যথার কথা জানানো মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সামগ্রিকভাবে ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ব্যথার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে পিঠ, নিতম্ব ও হাঁটুর ব্যথার মতো কিছু সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে।
ফিলিংহাম বলেন, ৫৫ বছরের আগে ব্যথার অভিযোগ বৃদ্ধিকে কোনো একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। যেমন—শারীরিক শ্রম, আঘাত, ওজন বৃদ্ধি, বিপাকীয় সমস্যা, মানসিক চাপ এবং একই ধরনের শারীরিক নড়াচড়া বারবার করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডারস-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের ক্রীড়া ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ভার্নন উইলিয়ামস বলেন, মধ্যবয়সে পৌঁছানোর আগেই অনেকের শরীরে বিভিন্ন আঘাতের প্রভাব জমতে থাকে। দীর্ঘ সময় শারীরিক চাপের মধ্যে থাকা, কাজকর্মের ধরন বদলে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক চাপও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে এসব বিষয় স্নায়ুতন্ত্রের ব্যথা প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে ব্যথার প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
গবেষকদের মতে, কোন বয়সে ব্যথার প্রবণতা দ্রুত বাড়ে, তা শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসকরা আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যথা নিয়ে তথ্যের ঘাটতি
গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যথাসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। ফিলিংহাম বলেন, মানব উন্নয়নের সূচকে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গবেষকদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং গবেষণায় তুলনামূলক কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অন্যান্য অঞ্চলে এ ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণার জন্য অর্থের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিনিময়ের সমস্যাকে এর প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যথা কীভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বয়সের মানুষকে প্রভাবিত করে, তা ভালোভাবে বুঝতে উন্নতমানের গবেষণা এবং তথ্যব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গবেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে কোথায় ব্যথার বোঝা বেশি এবং কোন প্রতিরোধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর, তা নির্ধারণ করা কঠিন হবে।
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা অবহেলা না করার পরামর্শ
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘদিনের ব্যথা যদি দৈনন্দিন কাজকর্ম, চলাফেরা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা সহ্য করে থাকা বা শুধু ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গ কমানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভার্নন উইলিয়ামস বলেন, কার্যকর চিকিৎসার জন্য প্রথমে ব্যথার ধরন ও এর অন্তর্নিহিত কারণ শনাক্ত করা জরুরি। সমস্যার ধরন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, ব্যায়াম, জীবনযাপনে পরিবর্তন, মনোযোগ ও সচেতনতা চর্চা এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা জটিল হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষকে সারা জীবন ব্যথা নিয়েই কাটাতে হবে।
চিকিৎসক সুচিতা গার্গও নিয়মিত ব্যায়ামের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ব্যায়াম ব্যথা কমাতে, শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। তবে সবার জন্য একই ধরনের ব্যায়াম উপযোগী নয়। নিয়মিত ব্যায়াম করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘস্থায়ী পেশি ও হাড়ের ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়াতে ব্যায়ামের পাশাপাশি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) এবং অ্যাকসেপ্ট্যান্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট থেরাপি সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব চিকিৎসাপদ্ধতির অর্থ ব্যথা কাল্পনিক বা কেবল মানসিক—এমন নয়। বরং ব্যথার অভিজ্ঞতা স্নায়ুতন্ত্র, শারীরিক স্বাস্থ্য ও আবেগীয় অবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাবিত হতে পারে।

-6acfa3fdd46ce.jpg)