অস্ত্রোপচারের আগে কেন খালি পেটে থাকতে বলা হয়?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অস্ত্রোপচারের আগে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে সকালে অস্ত্রোপচার নির্ধারিত থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা রোগীদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে এই নির্দেশের পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক কারণ।
মূলত অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় পাকস্থলীর খাবার বা তরল শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশের ঝুঁকি কমাতেই রোগীদের উপবাসে থাকতে বলা হয়। কতক্ষণ না খেয়ে থাকতে হবে, তা নির্ভর করে খাবারের ধরন, অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি, অ্যানেস্থেসিয়ার ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। তাই অস্ত্রোপচারের আগে উপবাসের নিয়ম মেনে চলা নিরাপদ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অ্যানেস্থেসিয়ার আগে উপবাস কেন জরুরি?
অস্ত্রোপচারের আগে না খেয়ে থাকার প্রধান উদ্দেশ্য হলো পালমোনারি অ্যাসপিরেশন প্রতিরোধ করা। এই অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার, তরল বা অন্যান্য উপাদান ভুল পথে শ্বাসনালি পেরিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে।
সাধারণ অবস্থায় কাশি ও গিলতে পারার মতো স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়াগুলো খাবারকে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। কিন্তু জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার সময় রোগী অচেতন থাকেন এবং এসব প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ শরীরের কিছু পেশি শিথিল করে দেয়। ফলে পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালির দিকে ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়তে পারে। এসব উপাদান ফুসফুসে প্রবেশ করলে প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সংক্রমণসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অস্ত্রোপচারের আগে পাকস্থলী যথেষ্ট খালি থাকলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়। এ কারণেই রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় খাবার ও পানীয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অ্যানেস্থেসিয়ার সময় পাকস্থলীতে কী ঘটে?
খাবার গ্রহণের পর পাকস্থলী ধীরে ধীরে তা হজম করে ক্ষুদ্রান্ত্রের দিকে পাঠায়। তবে সব খাবার একই গতিতে পাকস্থলী থেকে বের হয় না। খাবারের পরিমাণ, উপাদান এবং চর্বির মাত্রার ওপর এই প্রক্রিয়ার সময় নির্ভর করে।
সাধারণত স্বচ্ছ তরল পাকস্থলী থেকে তুলনামূলক দ্রুত বের হয়ে যায়। অন্যদিকে, শক্ত খাবার এবং বেশি চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে বেশি সময় নেয়। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় পাকস্থলীতে খাবার অবশিষ্ট থাকলে তা উলটো দিকে উঠে শ্বাসনালিতে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার সময় রোগী স্বাভাবিকভাবে সচেতন অবস্থার মতো নিজের শ্বাসনালি সুরক্ষিত রাখতে পারেন না। যদিও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞরা শ্বাসনালি সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তারপরও অ্যাসপিরেশনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা যায় না।
তাই অস্ত্রোপচারের আগে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উপবাসে থাকা রোগীর নিরাপত্তা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অস্ত্রোপচারের আগে কতক্ষণ না খেয়ে থাকতে হয়?
সব ধরনের খাবার ও পানীয়ের জন্য একই সময় উপবাসে থাকতে হয় না। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের পরিকল্পিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে প্রচলিত নির্দেশিকা অনুযায়ী সময়ের পার্থক্য দেখা যায়।
স্বচ্ছ তরল: অনেক ক্ষেত্রে অ্যানেস্থেসিয়া শুরুর দুই ঘণ্টা আগ পর্যন্ত পানি, শাঁসবিহীন স্বচ্ছ ফলের রস এবং দুধবিহীন চা বা কফির মতো পানীয় গ্রহণের অনুমতি থাকে।
হালকা খাবার: সাধারণত অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে থেকে খাওয়া বন্ধ রাখতে বলা হয়।
ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার: এসব খাবারের ক্ষেত্রে আট ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় উপবাসের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এগুলো সাধারণ নির্দেশিকা মাত্র। সব রোগীর জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং হাসপাতালের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী উপবাসের সময় পরিবর্তিত হতে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসক যদি সব ধরনের খাবার ও পানীয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন, তাহলে সাধারণ নির্দেশিকার ভিত্তিতে নিজে থেকে পানি বা অন্য কোনো পানীয় গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসক ও অ্যানেস্থেসিয়া দলের দেওয়া নির্দেশনাই সর্বাগ্রে অনুসরণ করতে হবে।
অস্ত্রোপচারের আগে খেয়ে ফেললে কী হতে পারে?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে অ্যানেস্থেসিয়ার সময় অ্যাসপিরেশনের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞকে নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়।
পাকস্থলী যথেষ্ট খালি না থাকার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে নতুন তারিখও নির্ধারণ করতে পারেন। তবে অস্ত্রোপচারের আগে কিছু খেয়ে ফেললেই যে অবশ্যই জটিলতা হবে, তা নয়। সিদ্ধান্তটি নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, কী খেয়েছেন বা পান করেছেন এবং কতক্ষণ আগে গ্রহণ করেছেন—এসব বিষয়ের ওপর।
ভুলবশত কিছু খেয়ে বা পান করে ফেললে বিষয়টি চিকিৎসক বা অ্যানেস্থেসিয়া দলকে অবশ্যই জানাতে হবে। খাবারের পরিমাণ কম হলেও, কিংবা অল্প পানি, দুধ বা অন্য কোনো পানীয় গ্রহণ করলেও তা গোপন করা উচিত নয়। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার নিরাপদে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নিরাপদ অস্ত্রোপচারের জন্য যা মনে রাখবেন
অস্ত্রোপচারের আগে না খেয়ে থাকার নির্দেশ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নিয়ম নয়; এটি অ্যানেস্থেসিয়ার সময় সম্ভাব্য গুরুতর জটিলতা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তাই কখন থেকে খাবার বন্ধ করতে হবে, কোন পানীয় গ্রহণ করা যাবে এবং কখন সব ধরনের গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে—এসব বিষয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা নেওয়া জরুরি।
নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলুন এবং ভুলবশত কিছু খেয়ে বা পান করে ফেললে তা চিকিৎসককে জানান। এতে চিকিৎসক দল আপনার নিরাপত্তা বিবেচনা করে সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।


