ক্যারিয়ার, বিয়ে, সন্তান—কেন বিশের কোঠার শেষ বছরগুলো এতটা কঠিন মনে হয়?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৭ এএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনের বয়স যখন বিশের কোঠার শেষের দিকে পৌঁছায়, তখন জন্মদিন উদযাপনের অনুভূতি আর আগের মতো থাকে না। কারণ এই সময়টাতে তরুণ-তরুণীদের মনে এক অদৃশ্য মানসিক চাপ কাজ করতে থাকে। সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া, পদোন্নতি পাওয়া, ক্যারিয়ার গড়া কিংবা সন্তান নেওয়া—সব মিলিয়ে এই দশকটিকে জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি সময় বলে মনে হয়।
অ্যাস্টার হোয়াইটল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী দিব্যাজি এবং নোভা আইভিএফ ফার্টিলিটির উর্বরতা বিশেষজ্ঞ ড. কেয়া পরাশর জৈন এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে সমাজের বিভিন্ন প্রত্যাশার কারণে বিশের কোঠার শেষ বছরগুলোকে এক ধরণের ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা বলে মনে হতে থাকে।
এই সময়টাতে অনেকেরই মনে হয় যে ক্যারিয়ার, আর্থিক অবস্থা, সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তানের পরিকল্পনা—জীবনের সবকিছুই একদম নিখুঁতভাবে গুছিয়ে ফেলা উচিত। যখন এই সমস্ত প্রত্যাশা একসঙ্গে মানুষের মনে ভিড় করে, তখন মনে হয় জীবন যেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেড়াজালে দৌড়াচ্ছে।
তুলনা করার মানসিকতা
জীবন কোনো প্রতিযোগিতায় জেতার দৌড় নয়। কিন্তু তবুও এটিকে অনেকেই ঠিক সেভাবেই দেখতে শুরু করেন। আর এই মানসিকতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা।
বন্ধু বা সমবয়সীরা যখন বিয়ে করছেন, বাড়ি কিনছেন, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাচ্ছেন কিংবা পরিবার শুরু করছেন, তখন অনেকেই মনে করেন যে তারা বুঝি পিছিয়ে পড়ছেন।
মনোবিজ্ঞানী দিব্যাজি বলেন, ‘মানুষ সাধারণত অন্যের জীবনের বাহ্যিক সাফল্য বা অর্জনের সঙ্গে নিজের ভেতরের অনিশ্চয়তার তুলনা করে, অথচ সেই অর্জনের পেছনে থাকা সংগ্রাম বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলোর কথা কেউ ভেবে দেখে না।’
দিব্যাজির মতে, এই বয়সের মানসিক চাপ কেবল বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমেই তৈরি হয় না; বরং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভয় বা অমূল্য সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও এই চাপ বাড়ে।
অনেক সময় মানুষ এমন একটি পেশা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে যা সে আসলে ভালোবাসে, অথচ সমবয়সীরা থিতু হয়ে গেছেন দেখে সে নিজেও চাপে পড়ে যায়। অথবা কেবল এই বিশ্বাস থেকে সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য বোধ করে যে, এই বয়সে এসে তার এই পর্যায়েই থাকা উচিত।
জীবনের ঘড়ির কাঁটা ও সময়ের তাড়া
ড. কেয়া পরাশর জৈনের মতে, বহু তরুণীই বর্তমানে জৈবিক ও সামাজিক সময়ের বেড়াজালে পড়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। বিয়ে, মাতৃত্ব এবং ক্যারিয়ার গড়ার বিষয়গুলো একসঙ্গে এসে উপস্থিত হয়, যার ফলে মনে হয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ে ফেলতে হবে।
কিন্তু প্রজনন স্বাস্থ্য বা উর্বরতা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি বিষয়, যার কোনো সামাজিক সময়সীমা নেই।
ড. জৈন বলেন, ‘প্রজনন স্বাস্থ্যের দিক থেকে বিচার করলে নারীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উর্বরতা বা ডিম্বাণুর গুণগত মান ও সংখ্যা কমতে শুরু করে। ত্রিশের দশকের শুরুর দিক থেকে এই প্রক্রিয়া ধীরে শুরু হয় এবং মধ্য ত্রিশ ও তার পরবর্তীতে তা আরও দ্রুত হ্রাস পায়।’
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি নারীকে একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে মা হতেই হবে অথবা পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের পর তিনি আর মা হতে পারবেন না।
ড. জৈন আরও জানান, যেসব নারী এখনো মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত নন, তাদের প্রজনন সংক্রান্ত সঠিক বিকল্পগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। যেসব নারী ভবিষ্যতে নিজের রক্তের সন্তান চান, তারা চাইলে ‘এগ ফ্রিজিং’ বা ডিম্বাণু সংরক্ষণের পদ্ধতিটি বিবেচনা করতে পারেন। তবে এটি ভবিষ্যতের গর্ভধারণের শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। এই পদ্ধতির সফলতা মূলত নারী কোন বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন এবং তার ডিম্বাণুর পরিমাণের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
এই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়
সমাজ আমাদের কাছে যা প্রত্যাশা করছে এবং আমাদের নিজের ভেতর থেকে যা চাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা খুবই জরুরি। বিয়ে করা বা সন্তান নেওয়া যেমন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি ইচ্ছা, ঠিক তেমনি ক্যারিয়ার, আর্থিক সচ্ছলতা, ব্যক্তিগত উন্নয়ন বা অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমানভাবে যৌক্তিক।
দিব্যাজি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, এই সিদ্ধান্তগুলো কি অন্যের সমালোচনা বা ভয়ের বশে নেওয়া, নাকি নিজের মূল্যবোধ এবং মানসিক প্রস্তুতির প্রতিফলন?’
এই মানসিক চাপ সামলানোর একটি কার্যকর উপায় হলো নিজের মূল্যবোধ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা। অন্যের সঙ্গে তুলনা করার অভ্যাস কমানো, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় সুস্থ সীমানা বা গণ্ডি তৈরি করা এবং একসঙ্গে সবকিছু না ভেবে একবারে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যা মানসিক শান্তি আনতে সাহায্য করে। একটা কথা সবসময় মনে রাখা দরকার—ক্যারিয়ার, সম্পর্ক বা অভিভাবকত্ব—জীবনের এই বড় বিষয়গুলো কখনোই একই সমান্তরালে বা নির্দিষ্ট কোনো নিয়মে চলে না।
দিব্যাজি আরও বলেন, ‘জীবনের এই বয়সটা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার মতো কোনো পরীক্ষা নয়। এটি হতে পারে নতুন কিছু আবিষ্কার, জীবনকে গুছিয়ে নেওয়া এবং পরিবর্তনের একটি দারুণ সময়।’
তবে যদি এই মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়, দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, সম্পর্ক নষ্ট করে বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তবে একজন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। এটি উদ্বেগের মূল কারণ খুঁজে বের করতে এবং নিজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে সাহায্য করবে।
মনে রাখবেন, জীবনকে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে তোলার কোনো নির্দিষ্ট শেষ সময়সীমা নেই।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

