অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন যেভাবে
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিজের কেনা কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি অন্য কারও নামে রেকর্ড হয়ে গেলে তা সংশোধন করে নিজের নামে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে জমির রেকর্ডে কী ধরনের ভুল হয়েছে, জমির মালিকানার প্রমাণ কী এবং রেকর্ডটি কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। নামের বানান বা হিসাবের ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া এক রকম, আর জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে রেকর্ড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা ভিন্ন হতে পারে।
তাই অন্যের নামে জমি রেকর্ড হওয়ার বিষয়টি জানার পর প্রথমেই জমির দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য নথি যাচাই করা জরুরি। এরপর সমস্যার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ কিংবা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হবে।
কী কারণে অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়?
বিভিন্ন কারণে জমির রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম উঠে আসতে পারে। জরিপের সময় তথ্য সংগ্রহে ভুল, জমি হস্তান্তরের পর রেকর্ড হালনাগাদ না করা, উত্তরাধিকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে ভুল কিংবা জাল দলিলের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কোনো জমি বৈধভাবে বিক্রি হওয়ার পরও নতুন মালিকের নাম সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত না হলে পুরনো মালিকের নাম রেকর্ডে থেকে যেতে পারে। আবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে একাধিক ওয়ারিশের অধিকার থাকলেও রেকর্ডে তাদের সবার নাম নাও থাকতে পারে। জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তির দাবি থাকলেও একই ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে খতিয়ানে কারও নাম থাকলেই তাকে সব ক্ষেত্রে জমির চূড়ান্ত মালিক বলে ধরে নেওয়া যায় না। জমির দলিল, পূর্ববর্তী খতিয়ান, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করে মালিকানার বিষয়টি নির্ধারণ করতে হয়।
জমির রেকর্ড সংশোধনে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে থাকলে নিজের মালিকানার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে হবে। জমির ধরন ও সমস্যার ওপর নির্ভর করে সাধারণত যেসব কাগজপত্র কাজে আসতে পারে, সেগুলো হলো—
১. জমি কেনা হলে নিবন্ধিত ক্রয়দলিল এবং প্রয়োজনে আগের মালিকের দলিল।
২. সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সংশ্লিষ্ট জরিপের খতিয়ান।
৩. জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, মৌজার নাম ও জমির পরিমাণের তথ্য।
৪. নামজারি করা হয়ে থাকলে নামজারি মামলার আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি।
৫. উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া হলে ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা বা বণ্টনসংক্রান্ত দলিল।
৬. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ ও জমির দখলসংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক প্রমাণ।
৭. জমি নিয়ে আগে কোনো মামলা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের আদেশ।
সব ক্ষেত্রে সব কাগজপত্র প্রয়োজন হয় না। জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং রেকর্ডে কী ধরনের ভুল রয়েছে, তা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নথি নির্ধারণ করতে হবে।
কী ধরনের ভুল হলে কোথায় যাবেন?
জমির রেকর্ডে অন্যের নাম থাকলেই একই পদ্ধতিতে সংশোধনের আবেদন করা যায় না। ভুলটি সাধারণ করণিক ত্রুটি, জরিপের ভুল, নামজারির সমস্যা নাকি মালিকানা নিয়ে বিরোধ—প্রথমে তা শনাক্ত করতে হবে।
নামের বানান বা হিসাবের ভুল হলে
খতিয়ানে নামের বানান, জমির পরিমাণ, হিস্যা কিংবা গাণিতিক হিসাবে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথি যাচাই করে দেখবে, ভুলটি সাধারণ করণিক ত্রুটি কি না এবং আইন অনুযায়ী ওই কর্তৃপক্ষের তা সংশোধনের ক্ষমতা রয়েছে কি না।
রেকর্ডের অবস্থা ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সংশোধনের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে প্রক্রিয়া সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।
জরিপের খতিয়ানে অন্যের নাম থাকলে
জরিপের সময় প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম রেকর্ড হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল ও জরিপের নথি যাচাই করতে হবে। রেকর্ডটি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত সর্বশেষ সংশোধিত রেকর্ড নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক ধারার অধীনে প্রতিষ্ঠিত ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়।
তাই জরিপের খতিয়ানে ভুল ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে দ্রুত ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। সব ধরনের রেকর্ডসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি একই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয় না।
জালিয়াতির মাধ্যমে জমি অন্যের নামে রেকর্ড হলে
কেউ জাল দলিল, মিথ্যা তথ্য কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে জমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে থাকলে বিষয়টি সাধারণ নামের ভুল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে মূল দলিল, আগের খতিয়ান এবং জালিয়াতির অভিযোগের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
সমস্যার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ, দেওয়ানি আদালত কিংবা অন্য উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে, তা নির্ভর করবে রেকর্ডের অবস্থা, বিরোধের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।
নামজারি অন্যের নামে হলে কী করবেন?
জমির নিবন্ধিত দলিল নিজের নামে থাকা সত্ত্বেও নামজারি অন্য ব্যক্তির নামে হয়ে থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি ও আদেশ সংগ্রহ করুন। কোন দলিল বা তথ্যের ভিত্তিতে ওই ব্যক্তির নামে নামজারি করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।
নামজারির প্রক্রিয়ায় ভুল হয়ে থাকলে প্রযোজ্য আইন ও বিধান অনুযায়ী আপিল, পর্যালোচনা বা সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে শুধু নামজারি সংশোধন করেই সব সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
নামজারি মূলত ভূমি রাজস্বসংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তাই নামজারিতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এক বিষয় নয়।
আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
জমির রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, জমির পরিচিতি যাচাই করুন। মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন। একই এলাকায় কাছাকাছি দাগ নম্বর কিংবা একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে ভুল শনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মালিকানার ধারাবাহিক প্রমাণ সংগ্রহ করুন। জমি কেনা, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে অর্জিত হলে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় দলিল ও নথি প্রস্তুত রাখুন। শুধু ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বা জমির দখল থাকলেই সব ক্ষেত্রে মালিকানা প্রমাণিত হয় না।
তৃতীয়ত, রেকর্ডের বর্তমান অবস্থা জানুন। খতিয়ানটি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা নিশ্চিত করুন। এর ওপর নির্ভর করতে পারে সংশোধনের পদ্ধতি ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।
চতুর্থত, বিরোধের প্রকৃতি বুঝুন। অন্য ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করলে উভয় পক্ষের নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। প্রকৃত বিরোধ থাকলে শুধু প্রশাসনিক আবেদন যথেষ্ট হবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
পঞ্চমত, সময়সীমার বিষয়টি গুরুত্ব দিন। নির্দিষ্ট ধরনের মামলা বা আইনি প্রতিকারের ক্ষেত্রে সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই ভুল শনাক্ত হওয়ার পর অযথা দেরি না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
সরকারি ভূমিসেবা কোথায় পাবেন?
জমির খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি রেকর্ডসংক্রান্ত সেবা সম্পর্কে তথ্য পেতে সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যেতে পারে।
- ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা পোর্টাল: https://land.gov.bd/
- ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: https://dlrs.gov.bd/
- বাংলাদেশের প্রচলিত আইন: https://bdlaws.minlaw.gov.bd/
অনলাইনে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখা অথবা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। জমির মালিকানা নিয়ে জটিল বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি দেখিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
শেষ কথা
অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে সংশোধন করা সম্ভব কি না, তা নির্ভর করে জমির মালিকানার প্রমাণ, ভুলের ধরন এবং রেকর্ডের বর্তমান অবস্থার ওপর। নামের বানান বা হিসাবের সাধারণ ভুলের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে, জরিপের চূড়ান্ত রেকর্ডে ভুল, নামজারি নিয়ে জটিলতা কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে জমি অন্যের নামে রেকর্ড হওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।
তাই প্রথমে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ করে সমস্যাটি চিহ্নিত করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা নিন। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

