পার্কিনসন রোগের যেসব প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা করলেই বাড়তে পারে ঝুঁকি
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পার্কিনসন একটি স্নায়বিক রোগ, যা মূলত মস্তিষ্কের চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে আক্রান্ত করে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, পেশির দৃঢ়তা এবং চলাফেরায় সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত রোগটির লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পার্কিনসন রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে মস্তিষ্কের বেসাল গ্যাংলিয়া অঞ্চলের স্নায়ুকোষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে বিবেচনা করা হয়। এসব স্নায়ুকোষ থেকে তৈরি হয় ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক উপাদান, যা শরীরের স্বাভাবিক চলাচল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডোপামিনের উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে চলাফেরা ও শারীরিক নড়াচড়ায় সমস্যা দেখা দেয়।
যদিও ঠিক কী কারণে এসব স্নায়ুকোষ নষ্ট হয়, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকেরা পার্কিনসন রোগের বেশ কিছু প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন। এসব লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক পার্কিনসন রোগের সাতটি প্রাথমিক সতর্কসংকেত।
১. বিশ্রামের সময় শরীর কাঁপা
পার্কিনসন রোগের সবচেয়ে পরিচিত প্রাথমিক লক্ষণগুলোর একটি হলো শরীরের বিভিন্ন অংশে অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি। বিশেষ করে আঙুল, হাত, চিবুক কিংবা পায়ের কোনো অংশে এ ধরনের কম্পন দেখা দিতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী এমনভাবে নড়াচড়া করে, যেন আঙুলের মধ্যে ছোট কোনো বস্তু গড়ানো হচ্ছে। একে 'পিল-রোলিং ট্রেমর' বলা হয়। সাধারণত বিশ্রাম নেওয়ার সময় এই কাঁপুনি বেশি স্পষ্ট হয় এবং কোনো কাজ করার সময় তুলনামূলক কমে যেতে পারে।
২. ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া
কোনো খাবার, ফুল কিংবা পরিচিত জিনিসের গন্ধ আগের মতো বুঝতে না পারাও পার্কিনসন রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় রোগের অন্যান্য উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই ঘ্রাণশক্তি কমে যায়।
সর্দি-কাশি বা নাক বন্ধ থাকার কারণে সাময়িকভাবে গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা কমতে পারে। তবে এ ধরনের কোনো সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ঘ্রাণশক্তি কমে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. চলাফেরার গতি কমে যাওয়া
পার্কিনসন রোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার গতি ধীর হয়ে যাওয়া। শুরুতে বিষয়টি সহজে বোঝা না গেলেও সময়ের সঙ্গে দৈনন্দিন কাজকর্মে এর প্রভাব বাড়তে থাকে।
এ ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন দেখা দিতে পারে—
- হাঁটার সময় পা ছোট ছোট করে ফেলা।
- পা টেনে বা ঘষে হাঁটা।
- চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া।
- হাঁটার সময় হাতের স্বাভাবিক দোল কমে যাওয়া।
- কাঁধ ও নিতম্বে শক্তভাব কিংবা ব্যথা অনুভব করা।
৪. কথা বলা ও হাতের লেখায় পরিবর্তন
পার্কিনসন রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কথা বলার ধরন এবং হাতের লেখায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর আগের তুলনায় নিচু, অস্পষ্ট কিংবা দ্রুত হয়ে যেতে পারে। অনেকের কথা বলার স্বাভাবিক ওঠানামা কমে গিয়ে কণ্ঠস্বর একঘেয়ে শোনায়।
এ ছাড়া হাতের লেখা ক্রমেই ছোট ও ঘন হয়ে আসতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে 'মাইক্রোগ্রাফিয়া' বলা হয়। আগে স্বাভাবিকভাবে লিখতে পারলেও ধীরে ধীরে অক্ষর ছোট হয়ে যাওয়া এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৫. ঘুমের সমস্যা
পার্কিনসন রোগের সঙ্গে ঘুমের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক নড়াচড়া, বিছানায় বারবার পাশ পরিবর্তন কিংবা স্বপ্নের সঙ্গে মিল রেখে হাত-পা ছোড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় পরিবারের সদস্য বা জীবনসঙ্গী আক্রান্ত ব্যক্তির আগেই এসব পরিবর্তন লক্ষ করেন। ঘুমের মধ্যে নিয়মিত অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৬. মাথা ঘোরা ও ভারসাম্যহীনতা
বসে থাকা অবস্থা থেকে হঠাৎ দাঁড়ালে মাথা ঘোরা কিংবা দুর্বল লাগা পার্কিনসন রোগের আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষণ। দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটার সময় ভারসাম্য ধরে রাখতেও সমস্যা হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যার পেছনে রক্তচাপ কমে যাওয়ার ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে দাঁড়ানোর পর রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পার্কিনসন রোগের সঙ্গে এ সমস্যার সম্পর্ক থাকলেও অন্য কারণেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৭. শরীরের ভঙ্গিতে পরিবর্তন
শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি বদলে যাওয়া বা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটার প্রবণতাও পার্কিনসন রোগের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কুঁজো হয়ে থাকা, শরীর বাঁকিয়ে হাঁটা কিংবা দীর্ঘ সময় ঝুঁকে থাকার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তবে এসব পরিবর্তন শুধু পার্কিনসন রোগের কারণেই হয় না। হাড়ের সমস্যা, পুরোনো আঘাত কিংবা অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণেও শরীরের ভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
যাদের আগে স্বাভাবিক শারীরিক ভঙ্গি ছিল, কিন্তু হঠাৎ বা ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকার প্রবণতা বাড়ছে, তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
পার্কিনসন রোগের এসব লক্ষণের এক বা একাধিক দেখা দিলেই যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত, তা নয়। একই ধরনের উপসর্গ অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। তবে লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ক্রমেই বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
একজন নিউরোলজিস্ট রোগীর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার ইতিহাস ও উপসর্গ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে পারেন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা সম্ভব।
