কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বৈদ্যুতিক শকের ঘটনা বাসাবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম কিংবা রাস্তায় যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে। এমন দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত সহায়তা করা জরুরি। তবে তাড়াহুড়ো করে তাকে স্পর্শ করতে গেলে উদ্ধারকারীর নিজেরও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রথম কয়েক মিনিটে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এরপর তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা, প্রয়োজনে সিপিআর (CPR) দেওয়া এবং পোড়া স্থানের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রথমেই যা করবেন
কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে সবার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তখনো বিদ্যুতের উৎসের সংস্পর্শে থাকেন, তাহলে তাকে সরাসরি স্পর্শ করবেন না। এতে উদ্ধারকারীও বিদ্যুতায়িত হতে পারেন।
সম্ভব হলে মূল সুইচ, সার্কিট ব্রেকার অথবা প্লাগ খুলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করুন। এ সময় হাত ও আশপাশের জায়গা শুকনো রাখুন।
দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব না হলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শুকনো কাঠের লাঠি বা ঝাড়ুর হাতলের মতো বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে থাকলে কাছে যাবেন না। অন্যদেরও দূরে সরিয়ে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও জরুরি সেবায় খবর দিন।
প্রথম মিনিট: নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
আক্রান্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের আগে বিদ্যুতের প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে হবে। বিশেষ করে ভেজা মেঝে, পানি বা ধাতব বস্তুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।
দ্বিতীয় মিনিট: শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করুন
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন আছেন কি না পরীক্ষা করুন। তার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে ডাকুন। এরপর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না দেখুন।
বুক ওঠানামা করছে কি না পর্যবেক্ষণ করে সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে শ্বাসের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। এ সময় অযথা দেরি করা যাবে না।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম মিনিট: প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন
আক্রান্ত ব্যক্তি যদি শ্বাস না নেন অথবা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে না পারেন, তাহলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করুন এবং সিপিআর শুরু করুন।
সিপিআর দেওয়ার সময় বুকের মাঝখানে হাতের তালুর নিচের অংশ রেখে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার চাপ দিতে হবে। বুকের ওপর চাপ দেওয়ার সময় দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে চাপ দিন। কাছে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে সেটি চালু করে যন্ত্রের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
অন্যদিকে, আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন থাকলে তাকে শুইয়ে বিশ্রামে রাখুন। শরীরের কোথাও পোড়ার চিহ্ন আছে কি না পরীক্ষা করুন এবং অযথা হাঁটাচলা করতে দেবেন না।
যদি ব্যক্তি শ্বাস নেন কিন্তু অচেতন থাকেন, তাহলে ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা না থাকলে তাকে একপাশে কাত করে রিকভারি পজিশনে রাখা যেতে পারে। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বৈদ্যুতিক শকে পুড়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা
আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে পোড়া স্থানটি ঠান্ডা প্রবাহমান পানির নিচে অন্তত ২০ মিনিট রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বরফ বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।
এরপর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত, ত্বকে আটকে যায় না এমন ড্রেসিং বা কাপড় দিয়ে পোড়া স্থানটি ঢেকে দিন। ফোস্কা ফাটানো যাবে না। পোড়া জায়গায় মাখন, তেল, টুথপেস্ট কিংবা কোনো ধরনের মলম লাগানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শরীরের পোড়া স্থানের কাছাকাছি থাকা আংটি, ঘড়ি বা আঁটসাঁট পোশাক খুলে ফেলুন। তবে ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকা কাপড় টেনে সরানোর চেষ্টা করবেন না।
শুধু শরীরের যে অংশে বিদ্যুৎ লেগেছে, সেটি পরীক্ষা করলেই হবে না। বিদ্যুৎ শরীরের অন্য অংশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই হাত, পা ও শরীরের অন্যান্য অংশেও পোড়ার চিহ্ন রয়েছে কি না খেয়াল করুন।
২০২২ সালে ‘অস্ট্রালেশিয়ান ইমার্জেন্সি কেয়ার’ জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পোড়ার ঘটনার তিন ঘণ্টার মধ্যে ২০ মিনিট ঠান্ডা প্রবাহমান পানির ব্যবহার ত্বক প্রতিস্থাপন বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কমাতে পারে।
তবে একই বছর ‘বার্নস’ জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে ঠান্ডা পানি ব্যবহারে অতিরিক্ত সুফল পাওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। যেহেতু বৈদ্যুতিক পোড়ার ক্ষতি ত্বকের গভীরেও হতে পারে, তাই প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
উদ্ধার করতে গিয়ে কিছু ভুল পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। তাই কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।
- বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করবেন না।
- তাকে সরানোর জন্য ভেজা কাপড়, ধাতব বস্তু বা খালি হাত ব্যবহার করবেন না।
- বিদ্যুতের সংযোগ চালু থাকা অবস্থায় ব্যক্তি বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ওপর পানি ঢালবেন না।
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাবার বা পানীয় দেবেন না।
- পড়ে গিয়ে আঘাত পেলে অপ্রয়োজনে তাকে নড়াচড়া করাবেন না।
- বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন না।
আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ থাকলেও হাসপাতালে নেওয়া জরুরি কেন?
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর শরীরে দৃশ্যমান কোনো ক্ষত না থাকলেও ভেতরে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। বৈদ্যুতিক প্রবাহ হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এ ছাড়া পেশির ক্ষতি, কিডনির ওপর চাপ, হাড় ভাঙা এবং স্নায়ুর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
২০২৩ সালে ‘ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইন কার্ডিওলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বৈদ্যুতিক আঘাতের ৩৩৩টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। এর অধিকাংশই ছিল ১ হাজার ভোল্টের নিচের নিম্ন ভোল্টেজের ঘটনা। গবেষণায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃদ্স্পন্দনের ছন্দে অস্বাভাবিকতা বা অ্যারিথমিয়া দেখা যায়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেসব রোগীর কোনো উপসর্গ নেই এবং প্রাথমিক ইসিজি (ECG) স্বাভাবিক, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ইসিজি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে ‘ব্রিটিশ প্যারামেডিক জার্নাল’-এ প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় বিলম্বিত অ্যারিথমিয়ার কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে গবেষণার তথ্য সীমিত হওয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর হাসপাতালে গিয়ে ইসিজি করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে গেলে, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, খিঁচুনি কিংবা শরীরের কোনো অংশ অসাড় হয়ে গেলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখবেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের প্রথম শর্ত হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে পারে।
