Logo
Logo
×

Advertisement

বিবিধ

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

Advertisement

Icon

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

ফাইল ছবি

Advertisement

স্ট্রোক একটি মারাত্মক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল স্ট্রোক। ওই বছর মোট মৃত্যুর প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল এই রোগ। তবে স্ট্রোকের প্রকোপ ও মৃত্যুহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে স্ট্রোক এখনো মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় দেড় কোটি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে মারা যান, আবার অনেকে দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের শিকার হন। স্ট্রোকে আক্রান্ত মানুষের একটি বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বাসিন্দা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশে স্ট্রোক প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

স্ট্রোক মানেই মৃত্যু কিংবা সারা জীবনের পঙ্গুত্ব নয়। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা।

প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালিত হয়। এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকির কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।

কেন হয় স্ট্রোক?

মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। প্রথমটিকে ইস্কেমিক স্ট্রোক এবং দ্বিতীয়টিকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়।

মস্তিষ্কের কোষ বেঁচে থাকার জন্য নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন ও পুষ্টি প্রয়োজন। রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ফলে রোগীর শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা, মুখ বেঁকে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা কিংবা ভারসাম্য হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

স্ট্রোকের কিছু ঝুঁকির কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেমন বয়স বৃদ্ধি ও পারিবারিক ইতিহাস। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ উচ্চ রক্তচাপ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে রক্তনালিতে বাধা সৃষ্টি হওয়া কিংবা রক্তনালি ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

অনেকের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন, লবণ কম খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে গেলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।

ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

ডায়াবেটিস রক্তনালির ক্ষতি করে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেশি থাকলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই নিয়মিত রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যাদের ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল বেশি, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে।

ধূমপান ছাড়ুন, শরীরচর্চা করুন

ধূমপান মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া জরুরি। পরোক্ষ ধূমপান থেকেও দূরে থাকতে হবে।

নিয়মিত শরীরচর্চা রক্তচাপ, ওজন, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা, যেমন দ্রুত হাঁটা, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য উপকারী। শারীরিক সক্ষমতা ও বিদ্যমান রোগ অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন নির্ধারণ করা উচিত।

এ ছাড়া অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসাও জরুরি

হৃদ্‌যন্ত্রের কিছু রোগ, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন নামের অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন, মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ধরনের জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ করে স্ট্রোক ঘটাতে পারে।

তাই অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন কিংবা অন্য কোনো হৃদ্‌রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত জমাট প্রতিরোধের ওষুধ স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

যাদের আগে স্ট্রোক বা ক্ষণস্থায়ী স্ট্রোকের মতো উপসর্গ (টিআইএ) হয়েছে, তাদের দ্বিতীয়বার স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণ চিনুন, দ্রুত হাসপাতালে নিন

স্ট্রোক প্রতিরোধের পাশাপাশি এর লক্ষণ চেনাও জরুরি। হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়া—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এ ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো কিংবা অজানা কারণে তীব্র মাথাব্যথাও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। রোগীকে দ্রুত স্ট্রোক চিকিৎসার সুবিধা আছে এমন হাসপাতালে নিতে হবে। লক্ষণ কিছুক্ষণের মধ্যে সেরে গেলেও অবহেলা করা যাবে না, কারণ এটি ভবিষ্যতে স্ট্রোক হওয়ার সতর্কসংকেত হতে পারে।

স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ অথবা ক্যাথেটারের সাহায্যে জমাট রক্ত অপসারণের চিকিৎসা মস্তিষ্কের ক্ষতি কমাতে পারে।

প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো উপায়

স্ট্রোক প্রতিরোধ কোনো একটি ওষুধ বা একটি অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। পাশাপাশি বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি।

মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে কখনোই দেরি হয়ে যায় না। আজ থেকেই জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনুন, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন এবং পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করুন। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও কর্মক্ষমতা রক্ষা করা সম্ভব।

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু 

সহযোগী অধ্যাপক 

ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগ

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল 

[email protected]

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হৃদরোগ কি শুধু বয়স্কদের? তরুণদের জন্যও ঝুঁকি

হৃদরোগ কি শুধু বয়স্কদের? তরুণদের জন্যও ঝুঁকি

দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় ৬৯ শতাংশের লিভারে চর্বি

দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় ৬৯ শতাংশের লিভারে চর্বি

৩০-এর আগেই ধমনিতে প্লাক, নীরবে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি

৩০-এর আগেই ধমনিতে প্লাক, নীরবে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি

নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া, ব্যায়াম—তারপরও হতে পারে হৃদরোগ, নেপথ্যে এই ৫ কারণ

নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া, ব্যায়াম—তারপরও হতে পারে হৃদরোগ, নেপথ্যে এই ৫ কারণ

হৃদরোগের উপসর্গ লুকিয়ে মা-বাবার জিনে, জেনে নিন ৭ বিষয়

হৃদরোগের উপসর্গ লুকিয়ে মা-বাবার জিনে, জেনে নিন ৭ বিষয়

হার্ট ভালো রাখতে গিয়ে যে ৫ ভুল করছেন অজান্তেই

হার্ট ভালো রাখতে গিয়ে যে ৫ ভুল করছেন অজান্তেই

আরও পড়ুন

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

স্ট্রোক প্রতিরোধ যোগ্য

‘ভিটামিন সি’ কি ব্লাড ক্যানসার প্রতিহত করতে পারে, জানাল গবেষণা

‘ভিটামিন সি’ কি ব্লাড ক্যানসার প্রতিহত করতে পারে, জানাল গবেষণা

দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় ৬৯ শতাংশের লিভারে চর্বি

দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় ৬৯ শতাংশের লিভারে চর্বি

চালের পানির ব্যবহারে কি নতুন চুল গজায়? যা বলছেন চিকিৎসক

চালের পানির ব্যবহারে কি নতুন চুল গজায়? যা বলছেন চিকিৎসক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম