Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন

ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন অচলাবস্থায় চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন অচলাবস্থায় চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যৌথ নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার কোনো সুরাহা না হওয়ায়, এবার অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে বাংলাদেশ। বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যমান কোনো ফলাফল না আসায়, খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় বেইজিংয়ের সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে ঢাকা।

দেশের ভেতরে নদী শুকিয়ে যাওয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে সরকার বাঁধ ও জলাধার নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পগুলো নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের নদী গবেষকদের মতে, ভারতের উজানে নির্মিত বাঁধ—বিশেষ করে ৫০ বছরের পুরোনো ফারাক্কা ব্যারেজ—বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে লবণাক্ততা ও মরুকরণ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।

ঢাকার ‘রিভার্স অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’ (আরডিআরসি)-এর গত বছরের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অন্তত ৭৯টি নদী ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে বা শুকিয়ে যাওয়ার পথে। উজানে পানি প্রত্যাহার এবং পলি জমার কারণে শুষ্ক মৌসুমে (লীন সিজন) এই নদীগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে সচলতা হারিয়েছে, যা দেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পদ্মা ও তিস্তা মেগা প্রকল্প

এই পটভূমিতে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার ২.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ এবং সংশোধিত ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ: বর্ষা মৌসুমের উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট ও লবণাক্ততা দূর করার উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিস্তা মেগা প্রকল্প: এটি চীন-অর্থায়িত একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ও ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্প, যার লক্ষ্য নদীভাঙন রোধ এবং ফসলি জমি রক্ষা করা।

সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা নদীতে গড় পানির প্রবাহ ছিল প্রায় ৭০,০০০ কিউসেক (ঘনফুট প্রতি সেকেন্ড)। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাব অনুযায়ী, বাঁধ চালুর পর এই প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে অনেক সময় মাত্র ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ কিউসেকে নেমে আসে।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভূরাজনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও মূলত গঙ্গা ও তিস্তা নিয়েই দীর্ঘদিনের বিরোধ। ২০১১ সালে তিস্তার অন্তর্বর্তীকালীন পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। চুক্তিটি নবায়নের বিষয়ে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, তিস্তা ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। ভারতের কাছ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়াও পাওয়া যায়নি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের জনগণকে।

ভারতের এই উদাসীনতার সুযোগে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরালো হচ্ছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তিস্তা প্রকল্পে ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই সমীকরণ বদলে গেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক ‘মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এর সিনিয়র ফেলো এবং আন্তঃসীমান্ত নদী বিশেষজ্ঞ উত্তম কুমার সিনহা বলেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত উদ্বেগের কারণ। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ঢাকা আজ বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। চীন বরাবরই ভারতের তৈরি করা শূন্যস্থান পূরণে পারদর্শী, তিস্তার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এটি ভারতের ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত—যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যকে যুক্ত করার একমাত্র সংকীর্ণ করিডোর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং ‘সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস’-এর নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমরা তিস্তা প্রকল্পের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারি না। ভারতকে বুঝতে হবে এটি একটি উন্নয়ন প্রকল্প, কোনো নিরাপত্তা কাঠামো নয়।

পরিবেশগত উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিলেও পরিবেশবাদীদের মধ্যে এগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণকে একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের ডেল্টা বা বদ্বীপ ইকোসিস্টেমের ক্ষতি করতে পারে এবং ভারতের কাছে গঙ্গার পানির ন্যায্য দাবি দুর্বল করতে পারে।

কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজজ্জামান বলেন, ব্যারাজ নিজে পানি তৈরি করতে পারে না। শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ঠিক কতটুকু পানি আসবে তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পদ্মা ব্যারাজ কোনো সুফল দিতে পারবে না।

গত ২০ মে থেকে কলকাতায় গঙ্গা চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের কারিগরি কমিটির চার দিনব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞ উত্তম সিনহার মতে, এবারের চুক্তিটি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি না হয়ে বাস্তবসম্মত পানি প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে স্বল্পমেয়াদি এবং প্রযুক্তিগত কাঠামোর ওপর জোর দিয়ে করা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনে যোগ দিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ালেও, ভারতের উজান থেকে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া বাংলাদেশের জন্য এই নদী সংকট মোকাবিলা করা অত্যন্ত দুরূহ হবে।

সূত্র: নিক্কেই এশিয়া

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

তিন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল

তিন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল

‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ পেলেন সাংবাদিক নাঈম আবির

‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ পেলেন সাংবাদিক নাঈম আবির

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

ইরান যুদ্ধে চীনের নীরব উপস্থিতি, বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

ভারত ৪-০ গোলে হারলেও মুগ্ধ দর্শকরা

ভারত ৪-০ গোলে হারলেও মুগ্ধ দর্শকরা

বৈধ ভিসা থাকলেই ঢোকা যাবে না ভারতে

বৈধ ভিসা থাকলেই ঢোকা যাবে না ভারতে

চীনের চোখরাঙানি পাত্তা দিল না তাইওয়ান

চীনের চোখরাঙানি পাত্তা দিল না তাইওয়ান

আরও পড়ুন

তিন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল

তিন ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল

যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদায়ন বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ পেলেন সাংবাদিক নাঈম আবির

‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ পেলেন সাংবাদিক নাঈম আবির

আখতারুজ্জামানের রিমান্ড শুনানিতে সাংবাদিক প্রবেশে বাধা

আখতারুজ্জামানের রিমান্ড শুনানিতে সাংবাদিক প্রবেশে বাধা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম