আলফাজ আহমেদ, রোকনুজ্জামান কান্চন ও মতিউর রহমান মুন্না। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তেইশ বছর আগে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে যে আনন্দে কেঁদেছিল বাংলাদেশ, সেই কান্না আর ফেরেনি। ২০০৩ সালের সেই রাত ছিল একটি জাতির স্বপ্নপূরণের রাত। মালদ্বীপের সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৫-৩ জয়। মোহাম্মদ সুজনের শেষ শট জালে জড়াতেই লাল-সবুজে উৎসব। প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।
সেই দলেরই অন্যতম সদস্য ফরোয়ার্ড আলফাজ আহমেদ। ২৩ বছর পরও তাঁর চোখে সেই রাতের ছবি স্পষ্ট। আলফাজের কথায়, ‘২০০৩ সালের দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল একতা আর আত্মবিশ্বাস। আমরা কাউকে ভয় পাইনি। বিশ্বাস ছিল, নিজেদের দিনে আমরা যে কাউকে হারাতে পারি। এখনকার দলেও প্রতিভা আছে। দরকার শুধু সেই বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনা।’
বাংলাদেশের সাফ-যাত্রার শুরুটা হয়েছিল আরও আগে। ১৯৯৫ সালে সেমিফাইনাল, ১৯৯৭-এ গ্রুপ পর্বে বিদায়। ১৯৯৯-এ আবার ফাইনাল। ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠেছিল শিরোপার মঞ্চে। ফাইনালে মালদ্বীপের কাছে ০-২ হার।
চার বছর পর সেই অপূর্ণতা মুছে যায়। ২০০৩-এ গ্রুপে তিন ম্যাচে তিন জয়, সেমিফাইনালে ভারতকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ হারিয়ে ফাইনাল। এরপর মালদ্বীপের সঙ্গে সেই টাইব্রেকারে ৫-৩। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।
রোকনুজ্জামান কাঞ্চনের স্মৃতিতে সেই দলটির আরেকটি শক্তি ছিল দেশের জন্য খেলার তীব্র আবেগ। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা শুধু একটা ম্যাচ জেতার জন্য খেলিনি। মনে হতো, আমাদের সঙ্গে পুরো বাংলাদেশ খেলছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা আমাদের শক্তি দিত। এখনকার খেলোয়াড়দেরও বুঝতে হবে, জাতীয় দলের জার্সির ওজন অনেক।’
২০০৫-এ আবার ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। করাচিতে ভারতের কাছে ০-২ হেরে রানার্সআপ। তারপর ধীরে ধীরে সাফল্যের আলো ফিকে হয়েছে। ২০০৮, ২০১১, ২০১৩, ২০১৫ ও ২০২১ গ্রুপ পর্বেই বিদায়। ২০০৯ ও ২০১৮তে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেও ফাইনালে যাওয়া হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৩ সালে আবার সেমিফাইনালে বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ।
১৯৯৫ থেকে ২০২৩,বাংলাদেশের ঝুলিতে একটি শিরোপা, দুটি রানার্সআপ ও দুটি সেমিফাইনাল। বাকি আসরগুলোতে হতাশা।
এই সময়টায় ভারত বহুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মালদ্বীপও শিরোপা জিতেছে একাধিকবার। আফগানিস্তান ২০১৩-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেখিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন শক্তিও উঠে আসতে পারে।
চলতি বছর বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দল সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফাইনালে ভারতকে টাইব্রেকারে হারানো সেই সাফল্য সিনিয়র দলের জন্যও একটি বার্তা। ভারতকে হারানো যায়, শিরোপাও জেতা যায়।
ডুলি আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে ১৫০-এর ঘরে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। জাতীয় দলকে এমন জায়গায় দেখতে চান, যেখানে বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক হবে না, একদিন তাদের বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন দেখবে।
শুধু প্রবাসী ফুটবলার কিংবা একজন কোচ দিয়ে বদলাবে না দেশের ফুটবল। স্কুল থেকে জেলা, জেলা থেকে একাডেমি, একাডেমি থেকে লিগ পুরো কাঠামোটাকেই শক্ত করতে হবে।
মিডফিল্ডার মতিউর রহমান মুন্নাও মনে করেন, জাতীয় দলের এই পরিবর্তনের মুহূর্তটাকে কাজে লাগাতে হবে। ‘আমাদের সময়ও সবকিছু নিখুঁত ছিল না। কিন্তু আমরা একটা দল ছিলাম। এখনকার ছেলেদের সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। তারা যদি পরিশ্রম করে, নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখে, তাহলে আবার সাফ জেতা সম্ভব। ২৩ বছর অনেক লম্বা সময়। আমরা যারা ২০০৩ সালে জিতেছিলাম, চাই নতুন প্রজন্ম আমাদের সেই আনন্দটা আবার দেখাক।’
ঘরের মাঠে যখন বাংলাদেশ নামবে, গ্যালারিতে থাকবে ২০০৩-এর স্মৃতি। থাকবে ১৯৯৯ হার, ২০০৫-এর ফাইনাল, একের পর এক গ্রুপ-ব্যর্থতা, ২০০৯ ও ২০১৮-এর সেমিফাইনাল, ২০২৩-এর ফিরে আসা।
নতুন প্রজন্ম অতীতের গল্প শুনে থাকতে চায় না। তারা নতুন ইতিহাস দেখতে চায়।তেইশ বছর আগে যে ট্রফি ঢাকায় এসেছিল, এবার কি আবার ফিরবে? উত্তর এখনই নেই।

