সাফ আয়োজনের আড়ালে কত টাকার খেলা?
Advertisement
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাঠে বল গড়ানোর আগেই টাকার অঙ্ক নিয়ে প্রশ্নের পাহাড়। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ঘিরে চলছে বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক আয়োজন। নামীদামি পৃষ্ঠপোষক, টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি আয়ের উৎসের অভাব নেই। এত আয়োজনের বাজেট কত? স্পনসরদের কাছ থেকে কত টাকা আসছে? সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি হয়েছে কত টাকায়? টিকিট থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রাই বা কত? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বিপুল অর্থের কতটা খরচ হবে ফুটবলের পেছনে, আর কতটা যাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঘরে? প্রশ্ন অনেক। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই।
৫ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে বসছে সাফের আসর। অতীতে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকত বাফুফে। এবার সেই জায়গা নিয়েছে সাফের বাণিজ্যিক স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ। বাফুফের বক্তব্য, আয়োজনের সঙ্গে তারা সরাসরি যুক্ত নয়। টিকিটের দাম থেকে শুরু করে স্পনসরশিপ, সম্প্রচার ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা সামলাচ্ছে সাফ এবং তার বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়াম, দেশের ফুটবলপ্রেমী এবং সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে কোটি টাকার বাণিজ্যের হিসাব কে দেবে?
জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠের দৈনিক ভাড়া মাত্র ৬০ হাজার টাকা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্ধারিত হারেই ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য মাঠ বরাদ্দ পেয়েছে টিএসএ। এতে মাঠ ভাড়া বাবদ পরিষদ পাবে ৯ লাখ টাকা। ম্যাচ হবে পাঁচ দিন ৫, ৮, ১১, ১৪ ও ১৭ নভেম্বর। এর বাইরে ফ্লাডলাইট ব্যবহারে ঘণ্টাপ্রতি ১০ হাজার টাকা এবং ডিজিটাল বোর্ড, ডিসপ্লেসহ আনুষঙ্গিক সুবিধার জন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে আয়োজকদের।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যমান যে ভাড়ার দাম রয়েছে, সেই মূল্যেই তাদের মাঠ দেওয়া হয়েছে। সামনে আমরা এই ভাড়া পর্যালোচনা করব।’
মাঠ ভাড়ার হিসাব মিটলেও গেটমানির ভাগ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অতীতে বাফুফের আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে গেটমানির ১৫ শতাংশ এবং প্রচারস্বত্বের ১০ শতাংশ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এবারও টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য অংশ নিয়ে আলোচনা চলছে। জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর কথায়, ‘টিকিট বিক্রি মাত্র শুরু হয়েছে। সেখান থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আয়ের অংশ নিয়ে আলোচনা চলছে।’
এখানেই প্রশ্ন আরও গভীর। সরকারি স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগেই গেটমানি ও প্রচারস্বত্বের ভাগ কেন চূড়ান্ত করা হলো না? বাণিজ্যিক স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত? টিকিট বিক্রি শেষ হওয়ার পর হিসাব নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে দায় নেবে কে?
বাফুফের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। সাফ ও বাফুফের সমঝোতায় বাফুফে ৫০ লাখ টাকা পাবে। আয়োজনের দায়িত্বে না থাকার দাবি করলেও আর্থিক প্রাপ্তির বিষয়টি রয়েছে। এই অর্থ কোন খাতের? বিনিময়ে বাফুফের দায়িত্ব কী? টিএসএ, সাফ ও বাফুফের মধ্যে দায়িত্ব এবং অর্থ বণ্টনের চুক্তি প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
স্পনসরশিপের বাজারও কম বড় নয়। শিরোপা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে টেকনো। পাশাপাশি আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস, হুঙ্কার, এসওএস ও টিকিফাইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা এসেছে। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের কনসার্ট ঘিরেও রয়েছে বাণিজ্যিক আয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকার চুক্তি করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা আয় কত, সেই অর্থের কতটা সাফ পাচ্ছে এবং কতটা টিএসএর হিসাবে যাচ্ছে তার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রচারস্বত্বের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাংলাদেশের টেলিভিশন সম্প্রচারক টি-স্পোর্টস। পাকিস্তানে মাইকো এবং বাংলাদেশে ডিজিটাল সম্প্রচারের জন্য টফির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান বাদে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারের ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব পেয়েছে বঙ্গ। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলেও সম্প্রচার আয় কত, সেই অঙ্ক প্রকাশ্যে আসেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতায় সম্প্রচারস্বত্ব আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে দর্শকদের ওপর। এবার সাফের টিকিটের মূল্য এক হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। ২০০৯ ও ২০১৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফের সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৫০ টাকার মধ্যে। সেই তুলনায় এবার মূল্য বেড়েছে বহুগুণ। আয়োজকদের যুক্তি, বিমানভাড়া, দল ও রেফারিদের যাতায়াত, স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা এবং ভিএআরের খরচ বেড়েছে। খরচ বাড়তেই পারে। সেই খরচের বিস্তারিত বাজেট কোথায়? কত টিকিট বিক্রির লক্ষ্য, সম্ভাব্য গেটমানি কত এবং টিকিটের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে তার হিসেব নেই।
জাতীয় স্টেডিয়ামের স্কাইলাউঞ্জ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সাংবাদিকদের ব্যবহারের জন্য ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত জায়গাটি বরাদ্দ দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক নিজে স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জন্য জায়গাটি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ টিএসএ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছে স্কাইলাউঞ্জ ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমও একই বিষয়ে সাংবাদিকদের অনুরোধ করছেন। বাফুফে যখন বলছে তারা আয়োজক নয়, তখন বাণিজ্যিক স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ফাহাদ করিমের এমন তৎপরতা কেন?
এই আয়োজনের শীর্ষে থাকা সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের অতীত অধ্যায়ও বিতর্কমুক্ত নয়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাফুফের সভাপতি থাকাকালে আর্থিক অনিয়মের মধ্যে ডুবে ছিলেন ।২০১৯ সালে দুদক বাফুফের আর্থিক নথি তলব করে। একই বছর ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ১৭ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০২৩ সালে হাইকোর্ট দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। ফিফার তদন্তে আর্থিক অনিয়মের দায়ে নিষিদ্ধ হন তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ। এসব ঘটনা সালাউদ্দিনের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণ করে। তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বের সময়কার প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

