গণতন্ত্রের বুলি আছে নেই পরমতসহিষ্ণুতা
jugantor
গণতন্ত্রের বুলি আছে নেই পরমতসহিষ্ণুতা

  এম এস আই খান  

২৮ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নগর অঞ্চলের মানুষের কাছে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত। স্বায়ত্তশাসিত এ প্রতিষ্ঠান তার আওতাধীন এলাকায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, আবর্জনা অপসারণ, যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার, জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে থাকে।

দেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা আছে, ‘নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জনশৃঙ্খলা, জনসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নবিষয়ক কার্যাবলী সম্পাদন করবে’।

তবে নাগরিকদের জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে রাজধানীর মেয়রদের দৌড়ঝাঁপ করতে হয় ৮টি মন্ত্রণালয় এবং ৫৬টি প্রতিষ্ঠানে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সেবার সঙ্গে জড়িত থাকায় নগরপিতাদের চলতে হয় তাদের সঙ্গে দেনদরবার করে।

আর তাই গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় শাসকদলের প্রার্থীরা ভোটারদের বলতেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তাদের পক্ষে স্থানীয় অর্থাৎ সিটির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা অন্যদের তুলনায় সহজ হবে’।

এ গত নির্বাচনের এই অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা থেকে বোঝা যায়, সেবা দানকারী অন্য সংস্থাগুলো ভিন্নমতের কেউ এলে তাকে খুব বেশি সুবিধা দেবেন না। সুতারং মেয়র হয়ে পড়বেন দাঁত ও নখবিহীন বাঘের মতো!

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, অভিন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল। ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে অভিন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এই দু’ভাগে ভাগ করার পর ২০১২ সালের ২৪ মে নির্বাচন হওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহের মাথায়ই নতুন সিটি কর্পোরেশনের সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আদালতের নির্দেশে তফসিল বাতিল হয়ে যায়।

অবশেষে ১৩ বছর পর ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে ১৬ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে।

ঢাকা উত্তরে ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ জন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল পান ৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০ ভোট।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৯৩ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাঈদ খোকন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপি’র প্রার্থী মির্জা আব্বাস পেয়েছিলেন ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯১ ভোট।

ওই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে দুপুর সাড়ে ১২টায় বিএনপি’র দুই মেয়রপ্রার্থী একযোগে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নির্বাচনের পরদিন অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ভোট জালিয়াতির মহোৎসব’, দেশের অন্য একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘জিতল আওয়ামী লীগ, হারলো গণতন্ত্র’।

২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আল মাসুদ হাসানুজ্জামান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে নির্বাচন’ বইয়ে নাসিম বানু মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতিতে বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে শাসকদল আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র রক্ষা এবং সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি গণতন্ত্র উদ্ধারে নিজ নিজ কর্মপন্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়। কিন্তু গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম উপাদান যে পরমতসহিষ্ণুতা, তা তাদের মাঝে অনুপস্থিত।’

 

গণতন্ত্রের বুলি আছে নেই পরমতসহিষ্ণুতা

 এম এস আই খান 
২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নগর অঞ্চলের মানুষের কাছে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত। স্বায়ত্তশাসিত এ প্রতিষ্ঠান তার আওতাধীন এলাকায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, আবর্জনা অপসারণ, যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার, জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে থাকে।

দেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা আছে, ‘নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জনশৃঙ্খলা, জনসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নবিষয়ক কার্যাবলী সম্পাদন করবে’।

তবে নাগরিকদের জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে রাজধানীর মেয়রদের দৌড়ঝাঁপ করতে হয় ৮টি মন্ত্রণালয় এবং ৫৬টি প্রতিষ্ঠানে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সেবার সঙ্গে জড়িত থাকায় নগরপিতাদের চলতে হয় তাদের সঙ্গে দেনদরবার করে।

আর তাই গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় শাসকদলের প্রার্থীরা ভোটারদের বলতেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তাদের পক্ষে স্থানীয় অর্থাৎ সিটির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা অন্যদের তুলনায় সহজ হবে’।

এ গত নির্বাচনের এই অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা থেকে বোঝা যায়, সেবা দানকারী অন্য সংস্থাগুলো ভিন্নমতের কেউ এলে তাকে খুব বেশি সুবিধা দেবেন না। সুতারং মেয়র হয়ে পড়বেন দাঁত ও নখবিহীন বাঘের মতো!

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, অভিন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল। ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে অভিন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এই দু’ভাগে ভাগ করার পর ২০১২ সালের ২৪ মে নির্বাচন হওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহের মাথায়ই নতুন সিটি কর্পোরেশনের সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আদালতের নির্দেশে তফসিল বাতিল হয়ে যায়।

অবশেষে ১৩ বছর পর ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে ১৬ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে।

ঢাকা উত্তরে ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ জন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল পান ৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০ ভোট।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৯৩ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাঈদ খোকন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপি’র প্রার্থী মির্জা আব্বাস পেয়েছিলেন ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯১ ভোট।

ওই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে দুপুর সাড়ে ১২টায় বিএনপি’র দুই মেয়রপ্রার্থী একযোগে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নির্বাচনের পরদিন অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ভোট জালিয়াতির মহোৎসব’, দেশের অন্য একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘জিতল আওয়ামী লীগ, হারলো গণতন্ত্র’।

২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আল মাসুদ হাসানুজ্জামান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে নির্বাচন’ বইয়ে নাসিম বানু মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতিতে বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে শাসকদল আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র রক্ষা এবং সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি গণতন্ত্র উদ্ধারে নিজ নিজ কর্মপন্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়। কিন্তু গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম উপাদান যে পরমতসহিষ্ণুতা, তা তাদের মাঝে অনুপস্থিত।’