Logo
Logo
×
   

আনন্দ নগর

দেশ-বিদেশের মঞ্চে দর্শকপ্রিয়

‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র উপাখ্যান

মুহম্মদ আকবর

মুহম্মদ আকবর

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র উপাখ্যান

প্রেম-প্রণয় ও প্রাণ বিসর্জন কিংবা বিরহগাথার আরেক নাম ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। এর পালাগুলো নেত্রকোণা, সুসং-দুর্গাপুর, গারো পাহাড়, কিশোরগঞ্জ, বাজিতপুর ও কেন্দুয়ার বিভিন্ন পল্লীগ্রামে ঘুরে ঘুরে লোকশ্রুতি হিসাবে বিভিন্ন বর্ষীয়ান পালাকার, বয়াতি, গায়ক, মাঝিমাল্লার কাছ থেকে সংগ্রহ করেন নেত্রকোনার মানুষ চন্দ্র কুমার দে।

পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দীনেশচন্দ্র সেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ নামে ১৯২৩ সালে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করেন। এরপর এটি ব্যাপকভাবে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ময় জন্ম দেয় জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিতদের মাঝেও।

তাই তো ফরাসি পণ্ডিত রোম্যাঁ রোলাঁ বলেছিলেন, ‘(মৈমনসিংহ গীতিকার) মদিনার চরিত্র অপূর্ব শিল্প-শ্রী মন্ডিত।’ আরেক ফরাসি পণ্ডিত হগম্যান বলেছিলেন, ‘ফরাসি সাহিত্যের তুলনায় বাংলার পল্লীগাথার সোন্দর্য সর্বকাল স্থায়ী।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলা পল্লী হদয়ের গভীর স্তর থেকে স্বতঃউচ্ছ্বসিত অকৃত্রিম বেদনার স্বচ্ছধারা। বাংলা সাহিত্যে এমন আত্মবিস্মৃত রস সৃষ্টি আর কখনো হয়নি।’

ষোড়শ শতক থেকে সপ্তদশ শতকে রচিত এ কালজয়ী পালাগুলো প্রকাশের শত বছর পেরিয়ে গেছে তবুও আবেদন কমছে না; নানা আঙ্গিকে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিনিয়ত চর্চা হচ্ছে। দেশে ও দেশের বাইরে অভিনয়শিল্পীদের প্রচেষ্টায় মঞ্চে শোভা পাচ্ছে মৈমনসিংহ গীতিকার অবলম্বনে নাটক, যাত্রাপালা, সিনেমা, টিভি নাটক।

* চন্দ্রাবতীর মলুয়া ও দস্যু কেনারামের পালা

সম্প্রতি নতুন নাট্যদল থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি তাদের প্রথম প্রযোজনা হিসাবে মঞ্চায়ন করেছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি নারী কবি চন্দ্রাবতী রচিত মৈমনসিংহ গীতিকার অমর পালা ‘মলুয়া’। শতাব্দীপ্রাচীন এ পালাটির ভাষ্য বয়ান ও নির্দেশনা দিয়েছেন সাইফুল জার্নাল। গানের দল ‘সর্বনাম’-এর সদস্য, বিভিন্ন নাট্যদলের অভিনয়শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও নাট্য পরামর্শকের যৌথ ভাবনায় প্রযোজনাটি মঞ্চে এসেছে।

এটির পরামর্শক হিসাবে যুক্ত আছেন নাট্যশিক্ষক সাইদুর রহমান লিপন। নির্দেশনা সহযোগী হিসাবে আছেন সাইদুর শাহীন। ফোক ড্যান্স ফিউশন করছেন ফরহাদ শামীম। লোক ও প্রচলিত ধারা বজায় রেখে মিউজিক ডিজাইন করেছেন গোপী দেবনাথ; তার সহযোগী হিসাবে আছেন প্রিয়ম মজুমদার। গানের সুর প্রচলিত ও নাট্যশিক্ষক ইউসুফ হাসান অর্কের কাছ থেকে সংগৃহীত।

এর আগেও ‘মলুয়া’ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নাট্য সংগঠন মঞ্চে এনেছে। নাটকের দল মেঠোপথ থিয়েটার ‘মলুয়ার প্রেমাখ্যান’ নামে মঞ্চে আনে। ‘মলুয়ার প্রেমাখ্যান’ নাটকটি রচনা করেছেন মু. আনোয়ার হোসেন রনি। এটি নব-নির্মাণ করেছেন শামীমা আক্তার মুক্তা ও রবিন বসাক। এর আগে এই নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন জয়িতা মহলানবীশ।

অন্যদিকে চন্দ্রাবতীর আরেক অমর সৃষ্টি ‘দস্যু কেনারামের পালা’। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত চমৎকার, ব্যতিক্রমী এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের এক অনন্য আখ্যান। ঈশ্বরগঞ্জ প্রভাতী সাংস্কৃতিক সংসদ এটি মঞ্চ আনে। ‘দস্যু কেনারামের পালা’র নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন আমিনুর রহমান সুলতান। নাটকটি বিটিভিতেও প্রচার হয়েছিল বলে জানা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এর আগে ‘দস্যু কেনারামের পালা’ মঞ্চায়ন করেছে বলে জানা গেছে।

* শোকগাথা সোনাই মাধব

মৈমনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে পদাবলী যাত্রা লোকনাট্য দল (সিদ্বেশ্বরী) ও লোকনাট্য দল (বনানী) দুই নাট্য দলই ‘সোনাই মাধব’ মঞ্চায়ন করেছে। লোকনাট্য দল (সিদ্বেশ্বরী) নাটকে ব্যবহৃত গানের সুরারোপ করেছেন দীনেন্দ্র চৌধুরী ও লিয়াকত আলী লাকী। নতুন আঙ্গিকে করা নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন লিয়াকত আলী লাকী। অন্যদিকে লোনাট্য দল বনানী করা ‘সোনাই মাধব’-এর নির্দেশক ইউজিন গোমেজ ও সংগীতে আছেন মোস্তফা আনোয়ার স্বপন।

* দ্বিজ কানাইয়ের মহুয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা মৈমনসিংহী গীতিকার অন্তর্ভুক্ত দ্বিজ কানাইয়ের রচনা ‘মহুয়া’ মঞ্চে এনেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরটির নির্দেশনায় ছিলেন রহমত আলী। নব্বই দশকের শুরুতে সেলিম আল দীন নিজেই মঞ্চে এসেছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর বাইরে এই ‘মহুয়া’র মঞ্চায়ন হয়েছে।

* দুই বাংলায় মাধব-মালঞ্চী ও কমলা সুন্দরী

‘কমলা সুন্দরী’ মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম জনপ্রিয় একটি আখ্যান। পালাটির মূল রচনা দ্বিজ ঈশান। এটির নাট্যরূপ ও গীত রচনা করেছেন আবদুল হালিম আজিজ। নাট্যতীর্থের এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন তপন হাফিজ। পশ্চিমবঙ্গেও মিনার্ভা নাট্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র ‘কমলা সুন্দরী’ মঞ্চে এনেছে। নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা ও নির্দেশক শ্রী গৌতম হালদার এটি মঞ্চে আনেন। শুধু তাই নয়, মৈমনসিংহ গীতিকা নামেই একটি নাটক মঞ্চে আনেন দুই বাংলা জনপ্রিয় নাট্যকার, নির্দেশক নাট্যাভিনেতা গৌতম হালদার। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ শিকড় নাট্য সম্প্রদায়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এটি বিভিন্ন জন এটি মঞ্চে এনেছেন।

কালকাতার নাট্যকার ও নির্দেশক বিভাস চক্রবর্তী মঞ্চে এনেছেন মৈমনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে রচিত ‘মাধব মালঞ্চী’। যা মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহের ‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা পালা’র আধুনিক ও পরিবর্তিত রূপ। কলকাতায় এটির নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন বিভাস চক্রবর্তী। বিভাস চক্রবর্তীর এই নাট্যরূপটি বাংলাদেশে নির্দেশনা দিয়েছেন থিয়েটার আর্ট ইউনিটের রোকেয়া রফিক বেবী। এ ছাড়া আরণ্যক থিয়েটার পাঠশালার ২১ তম আবর্তন করে ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ মঞ্চে আনে। এ ছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের পরিবেশনায় মৈমনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে ‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা’ নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আল জাবির।

* জয়তুন বিবির পালা ও আয়না বিবির পালা

মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে নির্মিত এ পালানাট্য ‘জয়তুন বিবির পালা’। রচনা ও নির্দেশনা দেন সায়িক সিদ্দিকী। এটি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মঞ্চায়ন করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। এ ছাড়া মৈয়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে প্রতিনিয়ত নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে। গবেষণা অব্যাহত আছে। মৈমনসিংহ গীতিকার ‘আয়না বিবির পালা’ মঞ্চে এনেছে নাট্যদল নাট্যধারা। নাটকটির নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন রবিউল আলম।

* কাজলরেখা

মৈমনসিংহ গীতিকায় সংকলিত ‘কাজলরেখা’ কাহিনি অবলম্বনে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিনয় করেন। ‘কাজলরেখা’ রচনা ও নির্দেশনায় রুবাইয়াৎ আহমেদ। এ ছাড়া আরও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও স্থানীয় পর্যায়ে ‘কাজলরেখা’ মঞ্চায়ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

* মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে যাত্রাপালা

মৈমনসিংহ গীতিকার ‘কাজলরেখা’ দেশের খুবই জনপ্রিয় যাত্রাপালা হিসাবে মঞ্চে এসেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এটি প্রদর্শিত হয়েছে বলে জানান যাত্রা গবেষক ও পালাকার এম এ মজিদ। তিনি যুগান্তরকে জানান, চল্লিশের দশকে খুলনার হাজের আলী শেখ ‘কাজলরেখা’ থেকে যাত্রাপালা করেন। এতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন খুলনার কাদের মলঙ্গী। পরবর্তী সময়ে মুন্সীগঞ্জের খালপাড়ের চেরু মিয়া এই চরিত্র করেন। প্রথম নারী হিসাবে এ চরিত্রে করেন নরসিংদীর ঝুমু রানী। তখন এ পালাটা সংস্কার করেন নরসিংদীর মুসলেম মাস্টার। সর্বশেষ মানিকগঞ্জের কৃষ্ণা অপেরা এটি মঞ্চায়ন করেন। নায়িকা চরিত্রে কৃষ্ণা নিজেই অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে কৃষ্ণার নাম হয়েছিল মুরশেদা। এ ছাড়া মহুয়া, সোনাই মধাব, চন্দ্রাবর্তীর জীবন নিয়ে যাত্রাপালা হয়েছে। এসব পালা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল বলে জানান এম এ মজিদ।

এ ছাড়া মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে নাটক, যাত্রা, গীতিনৃত্যনাট্য ও সিনেমা ঢাকা, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রদর্শিত হয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .