বিশেষ ফিচার ...
এখনো শীর্ষে অপূর্ব
Advertisement
অভি মঈনুদ্দীন
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকে রোমান্টিক নায়ক হিসাবে জনপ্রিয়তার ইতিহাসে কয়েকটি নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়। একসময় এ ঘরানায় দাপট ছিল আফজাল হোসেনের। এরপর দীর্ঘ সময় দর্শকের হৃদয়ে সেই জায়গা ধরে রেখেছিলেন মাহফুজ আহমেদ। তাদের পর যে অধ্যায়ের সূচনা, তার মধ্যে অন্যতম জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। প্রায় দুই দশক ধরে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয়ের নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি করেছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে নাটকের ভাষা বদলেছে, এসেছে নতুন মুখ, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু রোমান্টিক নাটকের পর্দায় অপূর্বর জায়গাটি এখনো যেন শূন্য হয়নি। বরং দুই দশক পরও তার নামের পাশে ‘শীর্ষে’ শব্দটি ব্যবহার করার মতো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন দর্শকরা। বিস্তারিত লিখেছেন অভি মঈনুদ্দীন
* দুই দশকের পথচলা
বগুড়ায় বেড়ে ওঠা অপূর্ব মিডিয়ায় পথচলা শুরু হয়েছিল একটি রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে। এরপর বিজ্ঞাপনে মডেলিং এবং পরে নাটকে অভিনয়। শুরুটা ছিল ধীরগতির, কিন্তু নিজের অভিনয়শৈলী, অভিব্যক্তি ও চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে আলাদা জায়গা তৈরি করেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন অপূর্ব। বিশেষ করে রোমান্টিক গল্পে তার স্বাভাবিক অভিনয়, চোখ-মুখের অভিব্যক্তি এবং সংলাপ বলার ধরন তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। এ কারণেই অনেকেই তাকে ‘এক্সপ্রেশন মাস্টার’ হিসেবে অভিহিত করেন। অভিনয়জীবনের তার অন্যতম মাইলফলক মিজানুর রহমান আরিয়ান পরিচালিত ‘বড় ছেলে’। নাটকটি প্রচারের পর দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি তৈরি করে নতুন ধরনের আলোচনার। এরপর একের পর এক ভিন্ন গল্প ও চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন তিনি।
* শীর্ষে থেকেও মাটিতে
প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ার, অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক, নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা-সবকিছু মিলিয়ে অপূর্বর অবস্থান যে এখনো শক্ত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন অভিনেতাদের ভিড়েও তার নাটকের জন্য দর্শকের অপেক্ষা থাকে। রোমান্টিক গল্পে তার উপস্থিতি এখনো নির্মাতা ও দর্শকের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তবে এত অর্জনের পরও নিজের অবস্থান নিয়ে অহংকার করতে নারাজ অপূর্ব। তার দর্শন খুব সরল-‘আমি আগেও মাটিতে ছিলাম, এখনো মাটিতেই আছি।’
* নতুনদের অনুপ্রেরণা
অপূর্বর দীর্ঘ পথচলার আরেকটি বড় অর্জন তার পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের ওপর প্রভাব। সিয়াম আহমেদ, তৌসিফ মাহবুব, জোভান, খায়রুল বাসার, ইয়াশ রোহানসহ বর্তমান প্রজন্মের অনেক অভিনেতাই বিভিন্ন সময়ে অপূর্বর অভিনয়কে অনুপ্রেরণা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। নাটকের গল্প, আড্ডা কিংবা অভিনয় নিয়ে আলোচনায় এখনো অনায়াসে চলে আসে তারই নাম। নতুনদের অনেকে যখন রোমান্টিক চরিত্রে কাজ করছেন, তখন তাদের অভিনয়ে অপূর্বর প্রভাব খুঁজে পান দর্শক ও সংশ্লিষ্টরা। তবে বিষয়টিকে প্রতিযোগিতা হিসাবে দেখছেন না এ অভিনেতা। বরং নতুনদের কাজকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন তিনি।
অপূর্বর মতে, তার পরবর্তী প্রজন্মের অনেক শিল্পীই ভালো করছেন। তারা শ্রম দিচ্ছেন, মনোযোগ দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের সময়টা কিছুটা কঠিনও। কারণ, তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নাট্যাঙ্গনে একাধিক কিংবদন্তি শিল্পী নিয়মিত কাজ করতেন, যাদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
* ‘আমি খুব লাকি’
নিজের সময়ের কথা বলতে গিয়ে অপূর্ব মনে করেন, কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করতে পারা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সৌভাগ্য। তিনি বলেন, ‘এখন অনেক কিংবদন্তি শিল্পী আর কাজ করছেন না। ফলে নতুনদের সামনে আগের মতো সেই অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার সুযোগ নেই। এদিক থেকে আমি খুব লাকি’। তবে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদেরও তিনি প্রশংসার চোখেই দেখেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাটকের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো মৌলিক ও বৈচিত্র্যময় গল্পের সংকট। গল্পের পরিধি সীমিত হওয়ায় নতুন গল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। তারপরও নতুন প্রজন্ম যে নতুন গল্পের সন্ধান করছে, সেটিকে ইতিবাচক দিক হিসাবে দেখেন এ অভিনেতা।
* নাটকেই স্বস্তি, সিনেমায় সুখবর
অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমায়ও পা রেখেছিলেন অপূর্ব। তবে শেষ পর্যন্ত তার কাছে নাটকই সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা হয়ে উঠেছে। কিন্তু সিনেমা নিয়ে আগ্রহ একেবারে হারিয়ে ফেলেননি তিনি। বরং নতুন একটি সিনেমা নিয়ে কথাবার্তা চলছে বলে জানিয়েছেন এ অভিনেতা। এ প্রসঙ্গে অপূর্ব বলেন, ‘সিনেমা নিয়ে আপাতত পরিকল্পনা ও কথাবার্তা হচ্ছে। এবার যদি হয়, ভালো কিছুই হবে। এর বেশি কিছু আপাতত বলতে চাইছি না।’ অর্থাৎ সবকিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন সিনেমা নিয়ে বিস্তারিত জানাতে চাইছেন না তিনি। তবে তার বক্তব্যে স্পষ্ট, বড় পর্দায় ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
* অভিনয়ের পাশাপাশি গানের মঞ্চে
অভিনয়ের বাইরে গানেও নিজের আরেকটি পরিচয় তুলে ধরেছেন অপূর্ব। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জীবনের প্রথম একক সংগীত সন্ধ্যায় অংশ নেন তিনি। কোনো স্পন্সর ছাড়াই আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে দর্শকের সামনে গান পরিবেশন করে প্রশংসা পান। অবশ্য এ অভিনেতার গান করার বিষয়টি তার ভক্তদের কাছে একেবারে নতুন নয়। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে নিজের সংগীতপ্রেমের জানান দিয়েছেন তিনি। নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রে আরও একটি একক শোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও কানাডায়ও শো করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছেন তিনি জানান।
* ব্যস্ততার ফাঁকে পরিবার
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ছিলেন তিনি। দেশে ফিরেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। ফিরেও অবশ্য খুব একটা অবসর পাননি অপূর্ব। এবার দেশে অবস্থানের সময়টুকু কাজে লাগিয়েছেন একের পর এক নাটকের শুটিংয়ে। রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যেমন শুটিং করেছেন, তেমনি কাজ করেছেন কক্সবাজারেও। এবার এস আর মজুমদার, মাসরিকুল আলম, মোরসালিন শুভ, রুবেল হাসান, জাকারিয়া সৌখিন ও মাহমুদুর রহমান হিমির পরিচালনায় নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। এস আর মজুমদার ও মোরসালিন শুভর একটি করে এবং অন্য পরিচালকদের দুটি করে নাটকে দেখা যাবে তাকে। এসব নাটকে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন নাজনীন নীহা, তটিনী ও শারলিন ফারজানা। শেষ নাটকটিতেও থাকছে বিশেষ চমক। তবে শুটিংয়ের এ ব্যস্ততার পরই আবার যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন অপূর্ব। আগামী ১০ অক্টোবর মেয়ের কাছে ফিরবেন তিনি। ১৪ অক্টোবর মেয়ের প্রথম জন্মদিন। সন্তানদের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এ অভিনেতা। অপূর্ব জানান, সবার সঙ্গে মিলেমিশে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের মধ্যদিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান। পাশাপাশি নিজের সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করাই তার অন্যতম বড় স্বপ্ন।
