পেয়েছেন জয়িতা সম্মাননা
স্টেশনে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু পরিনা এখন সফল উদ্যোক্তা
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আজ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাড়ে তিন দশক আগের কথা। সময়টা ১৯৯২ অথবা ১৯৯৩ সাল। বগুড়ার শান্তাহার রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ১০ মাসের একটি শিশুকন্যা চিৎকার করে কাঁদছিল।
স্টেশনের কলার ব্যাপারি আব্দুল ওহাব শিশুটির কান্না শুনতে পান। ওহাব ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নেন। বাচ্চা কার বলে তিনি হাঁকডাকও দেন। দূর থেকে এক নারী এই দৃশ্য দেখছিলেন। ওই নারীর কাছে গিয়ে ওহাব বললেন, ‘বাচ্চাটা কি তোমার?’ তিনি কোনো কথা বললেন না। তখন ওহাব বলেন, ‘আমার কোনো ছেলেমেয়ে নাই। বাচ্চাটা আমি নিয়ে গেলাম। বাচ্চাটা যদি তোমার হয়, কোনো দিন মন চাইলে আমার বাড়িতে এসে দেখে যেয়ো।’ এই বলে তিনি ওই নারীকে তার ঠিকানা দিয়ে আসেন। তবে, ওই নারী কোনো দিন ওহাবের বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে দেখতে যাননি। ওহাব শিশুটিকে নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের ননুজ গ্রামে তার বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর নিজ সন্তানের মতো যত্নে লালন-পালন শুরু করলেন। নাম রাখলেন পরিনা। ওহাবের বাড়িতে শুরু হলো শিশুটির জীবনের নতুন অধ্যায়। বড় হতে থাকল সে। কলার ব্যাপারি ওহাবের আয় সীমিত। সংসার কোনোমতে চলে। পরিনা এখন ৩৪ বছরের এক নারী। শত সীমাবদ্ধতা আর সমস্যাকে জয় করে সে স্নাতক পাশ করেছে। পালক বাবা-মাকে দেখাশোনার জন্য বিয়ে করেননি। তবে ওহাব ২০২২ সালে ফুসফুসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে অনলাইনে ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছে পরিনা। এই লড়াইয়ের মধ্যেই পরিনা লেখালেখির অভ্যাসও গড়ে তুলেছেন। ২০২৪ সালে পেয়েছেন জয়িতা সম্মাননা। আব্দুল ওহাবের স্টেশন থেকে নিয়ে যাওয়া পিতৃ-মাতৃহীন শিশুটি এখন সফল উদ্যোক্তা। পরিনা বলেন, অনলাইনে এখন আমার মূল ব্যবসা আম ও খেজুরের গুড় বিক্রি। এরই ফাঁকে বিভিন্ন গাছের চারাও অনলাইনে বিক্রি করি। আমের মৌসুম শেষ হলে শীতকালে খেজুরের গুড়ের ব্যবসা করি। পাশাপাশি খাঁটি ঘি ও চাষের মধু বিক্রি করি। মাঝেমধ্যে নিজেই পণ্য সরবরাহের কাজ করি। অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে পরিনা বলেন, একটা সময় আমার জন্ম-ঠিকানা নিয়ে দুঃখ থাকলেও এখন আর তা নেই। আমার গর্ভধারিণী মা যে-ই হোক না কেন, তার প্রতিও আমার কোনো রাগ নেই। কারণ, আমি নিজে চলতে গিয়ে প্রতি ধাপে ধাপে বুঝতে পারছি, মেয়েদের এই সমাজে নিজের পায়ে দাঁড়ানো কতটা কঠিন। বর্তমানে অনলাইনে ব্যবসা করে পরিনা মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করেন। এই ব্যবসার সুবাদে দেশব্যাপী এখন তিনি পরিচিতি লাভ করেছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিনা বলেন, আমি আরও কয়েকজনকে নিয়ে আনন্দ আশ্রম নামে একটি বৃদ্ধাশ্রম করতে চাই। এজন্য রাজশাহীর বানেশ্বরে ছয় শতক জমিও কিনেছি। এজন্য অবশ্য আমাকে কিছু টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে তা পরিশোধ করছি। পাশেই আরও এক খণ্ড জমি রয়েছে। সেটিও কেনার ইচ্ছে আছে। আগামীতে অসহায় বৃদ্ধদের সেবা করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।

