ব্যাংক সংস্কারে রূপরেখা নেই
রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা ব্যাংক খাত সংস্কারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো বাস্তব রূপরেখা নেই। ব্যাংক সংস্কারকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসাবে তুলে ধরা হলেও সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের বদলে কেবল নীতিগত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সরকার। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকায় সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
এদিকে ব্যাংক খাত থেকে এবার ঋণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার ব্যাংক খাত থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ কম নেবে সরকার। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে ঋণের এই লক্ষ্য অবাস্তব। কারণ, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হলে তখন ব্যাংকের দিকেই ঝুঁকবে সরকার। এতে বঞ্চিত হবে বেসরকারি খাত। কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাবেন না উদ্যোক্তারা। আবার প্রকৃত সংস্কার না হলে এই খাত ক্রমেই নিচের দিকেই তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাত থেকে ঋণের যে লক্ষ্য, এটা অবাস্তব বললেও কম বলা হবে। কারণ, সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেই। অতীতের সব সরকার তাই করেছে। নইলে তারা টাকা পাবে কোথায়? এ লক্ষ্য আর অঙ্গীকার সংকটকালে কারও মনে থাকবে না। যদিও বাজেট বক্তৃতায় সরকার খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী ধরনের আইনি, প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বাজেটে বিস্তারিত কিছু নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট খেলাপি ঋণ। কয়েক বছর ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা এবং দুর্বল তদারকির কারণে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাজেটে খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলা হলেও বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, সম্পদ জব্দ, বিদেশে পাচার করা অর্থ শনাক্তকরণ কিংবা ঋণ আদায়ের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপের ঘোষণা নেই।
ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্বল ব্যাংকগুলোর টিকে থাকা। বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামোয় কী পরিবর্তন আসবে? যারা অতীতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর বাজেটে অনুপস্থিত।
বিশ্লেষকদের মতে, পুনঃমূলধনীকরণ যদি শুধু সরকারি অর্থ ঢেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংককে টিকিয়ে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রয়োজন পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা।
বাজেটে ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাস্তবে ব্যাংক পরিচালনা থেকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত ছিল। অর্থ পাচার রোধ ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোন দেশগুলোর সঙ্গে তথ্যবিনিময় চুক্তি হবে, কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ফিরিয়ে আনা হবে কিংবা এ কাজে কত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই।
পুঁজিবাজার ও বিকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বেশকিছু ঘোষণা রয়েছে। করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন স্থবির বন্ড বাজারকে সচল করতে কর সুবিধা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বা নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মতো বিষয়গুলো বাজেটে স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি।

