খুলনা-৫ ও ৬ আসন
দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষের দৃষ্টি সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে
আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খুলনার দুই গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) ও খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) এ এবার নির্বাচনে হিন্দু ভোটাররা জয়-পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসাবে উঠে এসেছে। দুই আসনেই মোট ভোটারের উল্লেখযোগ্য অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হিন্দু ভোটব্যাংক। নির্বাচনি মাঠে প্রতীকভিত্তিক লড়াই যতটা দৃশ্যমান, নীরবে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংখ্যালঘু ভোটারদের মন জয়ের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষের প্রার্থীরা হিন্দু ভোটারদের সমর্থন পেতে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন। আসন দুটি জামায়াতের আসন হিসাবে পরিচিতি পাওয়ায় আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপির প্রার্থীরা। অতীতের হিসাব এবং আসন্ন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে আসন দুটিতে ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা-৫ আসন : ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় হিন্দু ভোটারদের প্রভাব কম নয়। বিশেষ করে ডুমুরিয়ার গ্রামাঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট ঐতিহাসিকভাবে ফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখে আসছে। এ আসনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে তীব্র। একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় ভোট বিভাজনের সম্ভাবনাও বেশি। এ আসনে প্রায় ৩০ শতাংশ হিন্দু ভোটার। এমন পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ভোট একদিকে গেলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সুইং ফ্যাক্টর। দুই উপজেলা মিলে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার হিন্দু ভোট রয়েছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং মামলা-হয়রানি বন্ধের নিশ্চয়তা চান। পাশাপাশি ভূমি দখল ও মন্দির, শ্মশান সুরক্ষার বিষয়টিও তাদের ভোট সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলবে।
ভোটের বিষয় নিয়ে বিএনপির প্রার্থী আলী আসগর লবী বলেন, বিএনপি সাম্প্রদায়িক দল নয়। এখানে হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ফলে মানুষ এবার বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকেই বেছে নেবে।
খুলনা-৫ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জিতেছে ৫ বার। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জিতেছেন একবার। তবে এ আসনে প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় এসেছে বারবার। ২০০১ সালে যখন জামায়াতের প্রার্থী জিতেছে তখন ভোটাররা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমপি গাজী সালাহউদ্দিন ইউসুফ ও নারায়ণ চন্দ্র চন্দের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে জোট করে সংখ্যালঘু ভোটাররা। তারা নৌকা বর্জন করে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী গোলাম পরওয়ারকে প্রথমবারের মতো বিজয়ী করে। ওই বিজয়ের পর মিয়া গোলাম পরওয়ার শুধু এই দুই উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩শ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করে। এসব কারণে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। ওই সময় তিনি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন। ফলে সংসদীয় এলাকায় গোলাম পরওয়ারের আলাদা ইমেজ তৈরি হয়।
হিন্দু ভোটের বিষয় নিয়ে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের মানুষ মিলে আমাকে এর আগেও নির্বাচিত করেছেন। তারা আমাকে চেনেন ও জানেন। সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করেছে। বিশেষ করে হিন্দু বা অন্য ধর্মের কাউকে বঞ্চিত করা হয়নি। সেই সময় এখানে প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করেছি। এবারও তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করবেন।
খুলনা-৬ আসন : কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় হিন্দু ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। সুন্দরবনঘেঁষা এই এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, চিংড়ি ঘের দখল ও ভূমিবিরোধ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের সূত্র জানায়, এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫৬২ জন। এর মধ্যে পাইকগাছায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২ জন এবং কয়রায় ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫শ। বিপুল পরিমাণ ভোটারের মধ্যে হিন্দু ভোটার ৯৪ হাজার ৬১৩ জন। যা মোট ভোটারের প্রায় ২৩ শতাংশ। এ আসনে হিন্দু ভোটাররাই মূলত প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, হিন্দুসহ অন্য ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা চায়। বিএনপির নেতাকর্মীরা সেই নিরাপত্তা দিতে তৎপর রয়েছে। অতীতের মতো এবারও ধানের শীষের প্রতীককে বিজয়ী করতে সব মানুষ একতাবদ্ধ হয়েছে।
বিগত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছে বেশিবার। ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ রুহুল কুদ্দুস ৭শ ভোটে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ মো. নুরুল হককে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রায় ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের নুরুল হক জামায়াতের প্রার্থী রুহুল কুদ্দুসকে পরাজিত করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতের রুহুল কুদ্দুস প্রায় ৩৮ হাজার ভোটে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নুরুল হক প্রায় ১৬ হাজার ভোটে বিজয়ী হন। ফলে ভোটের পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে হিন্দু ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকেছে সেই দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, শুধু হিন্দু নয়-সব ভোটারদেরই আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। অতীতের নির্বাচনে সব মানুষ আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে। আমাদের দ্বারা কোনো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, হবেও না। এবারও রাখবে ইনশাআল্লাহ।
