আটকা পড়েছেন ১৮ হাজারের বেশি যাত্রী
টিকিট আছে ফ্লাইট নেই
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ছুটি শেষে কাজে ফেরার কথা ছিল আনোয়ার হোসেনের। বিমানবন্দরে এসে তিনি জানতে পারেন ফ্লাইট বাতিল। বাধ্য হয়ে ফিরে গেলেন গ্রামের বাড়িতে। সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার পর আনোয়ারের মতো এমন অনেক প্রবাসী যাত্রী গত ৮ দিনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এ সময়ে ঢাকা থেকে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আটকা পড়েছেন ১৮ হাজারের বেশি যাত্রী। ফ্লাইট বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। যাত্রীদের চিরচেনা ভিড়, স্বজনদের অপেক্ষা আর গাড়ির দীর্ঘ সারি-কিছুই নেই আগের মতো। অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে বিমানবন্দরের আগমন ও বহির্গমন টার্মিনাল। তবে ভিসা ও চাকরি হারানোর শঙ্কায় কেউ কেউ বিকল্প রুটে সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সেখানেও স্বস্তি নেই। বেড়েছে টিকিটের ভাড়া। সৌদি আরবেরও একই চিত্র। দেশটি থেকে দেশে ফিরতে পারছেন না হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে যাত্রী ভোগান্তি আরও বাড়বে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, রিয়াদ-দাম্মামের মতো প্রধান রুট বন্ধ থাকলে যাত্রী চাপ জেদ্দা ও মদিনায় গিয়ে পড়ে। ফলে টিকিটের ভাড়া বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এয়ারলাইন্সগুলোর উচিত বাতিল টিকিটের অর্থ ফেরত বা তারিখ পরিবর্তনের সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানানো। পাশাপাশি বিকল্প রুটে অতিরিক্ত ভাড়া যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেবিচকেরও নজরদারি প্রয়োজন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন যুগান্তরকে বলেন, রিয়াদ রুটের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যাত্রী চাপ কিছুটা কম। সময়সূচি, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন ও অন্যান্য তথ্য জানতে যাত্রীদের বিমানের বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকা থেকে গত ৮ দিনে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে ১১৮টি ফ্লাইট। এতে আটকা পড়েছেন ১৮ হাজার ৩৬২ যাত্রী। রোববার বেবিচক জানিয়েছে, বাতিল বা স্থগিত ফ্লাইটের মধ্যে ৫২টি সরাসরি এবং ৬৬টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৯টি, ইউএস-বাংলার এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ১৩টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১০টি রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ভারতের ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের যাত্রীরা। তাদের ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, সালাম এয়ারের ৭টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৬টি এবং ইজিপ্ট এয়ারের ১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
এর আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে হুথিদের ড্রোন হামলায় সোদি আরবের আভা বিমানবন্দরে একটি বাণিজ্যিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে দাম্মামসহ ছয়টি রুটে বিমান ফ্লাইট স্থগিত করেছিল, তবে তখন রিয়াদ ও জেদ্দা বিমানবন্দর চালু ছিল। এবার সৌদির দুই প্রধান প্রবেশদ্বার রিয়াদ ও দাম্মাম একসঙ্গে বন্ধ হওয়ায় প্রভাব অনেক বেশি। রিয়াদ ও দাম্মামের পথ বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বড় অংশ জেদ্দা ও মদিনার টিকিটের দিকে ঝুঁকছেন। রিয়াদের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় প্রবাসী শরিফুল ইসলাম মদিনার টিকিট কাটেন। সেখানে তাকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে। শরিফুল যুগান্তরকে বলেন, দ্রুত যেতে হবে, তাই টাকার কথা ভাবিনি টিকিট কেটে ফেলেছি। ভোগান্তি শুধু টিকিটে থামছে না। তিন মাস বা এক বছরের ছুটিতে আসা অনেক কর্মীর ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। সময়মতো কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি হারানোর শঙ্কাও আছে। যদিও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে রিয়াদগামী যেসব যাত্রী টিকিট কেটেও যেতে পারছেন না তাদের অন্য রুটে পাঠানো হচ্ছে। যাত্রী চাপ সামলাতে মদিনা রুটে বড় উড়োজাহাজ ব্যবহার হচ্ছে, যা ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। ১৯ অক্টোবর থেকে সেখানে আবার নিয়মিত বোয়িং ৭৮৭ চলবে। জেদ্দা রুটেও অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ফাঁকা শাহজালাল, নেই চিরচেনা কোলাহল : সৌদি আরবের ফ্লাইট বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সার্বিক পরিবেশেও। এক সময় যেখানে যাত্রী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকত না, সেখানে এখন আগমন ও বহির্গমন টার্মিনাল অনেকটাই নীরব। বিমানবন্দরের সামনের গাড়ি পার্কিং এলাকাও প্রায় ফাঁকা। যাত্রী চাপ কমে যাওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছেন দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাও। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের বাইরের দোকানগুলোতে বেচাকেনাও কমেছে।
রোববার সরেজমিন দেখা যায়, আগমন টার্মিনালের দুই অংশেই কোলাহল কমে গেছে। যাত্রীদের নিতে স্বজনদের তাড়াহুড়া, টার্মিনালে প্রবেশের জন্য ভিড় কিংবা লাগেজের ট্রলি সংগ্রহে দৌড়ঝাঁপ-কোনোটিই চোখে পড়েনি। একই সময়ে একাধিক ফ্লাইট অবতরণের পর যাত্রীদের বের হওয়ার যে চাপ তৈরি হয় তাও দেখা যায়নি। বিমানবন্দরের সামনের গাড়ি পার্কিং এলাকাও ছিল প্রায় ফাঁকা। দুবাই থেকে আসা ভাইকে নিতে এসেছেন আনিসুর রহমান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে এমন অবস্থা আগে দেখিনি।
আগমন টার্মিনালের মতো বহির্গমন অংশেও যাত্রীদের চাপ কমেছে। সৌদি আরবগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ওই রুটের যাত্রীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ওমরাহ যাত্রীদের কিছু উপস্থিতি থাকলেও স্বাভাবিক সময়ের মতো যাত্রীদের ঢল দেখা যায়নি। কাতারের দোহাগামী যাত্রী রবিউল হোসেন বলেন, দুই মাস আগে ফেরার সময় ক্যানোপিতে যে ভিড় দেখেছিলেন, আজ যাওয়ার সময় তা না দেখে অবাক হয়েছেন। আরেক দোহাগামী যাত্রী তরিকুল ইসলামের আশঙ্কা, সৌদির পরিস্থিতি ভালো না হলে এমনই থাকবে।
বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে দায়িত্বরত এপিবিএন সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, যাত্রী নেই, তাই বিমানবন্দর ফাঁকা। আগে যাত্রী ও স্বজন সামলানোর যে চাপ ছিল, এখন তা নেই। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার চাপ বাড়বে। যাত্রী চাপ কমে যাওয়ায় বিমানবন্দরের বাইরে দোকানপাটের ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে। যাত্রী ও তাদের স্বজনদের ঘিরে যেসব দোকানে নিয়মিত বেচাকেনা হতো, সেখানে এখন ক্রেতার আনাগোনা কম।
রিয়াদগামী ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা পাওয়ার পর ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পুনরায় চালু করতে চায় সংস্থাটি। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে বিমান। ফ্লাইটের সময়সূচি, পুনরায় চালু এবং টিকিটসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যাত্রীদের কাছের বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে। এদিকে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাহনুর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আমরা ফ্লাইট পরিচালনার সময়সূচি নির্ধারণ করব। এখন পর্যন্ত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে তারা আমাদের কিছু জানায়নি। অনুমতি পাওয়া গেলে ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মামগামী ফ্লাইট চালু করা হবে।
বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী প্রভাব : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। সৌদি আরব বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। দেশটি থেকে আসে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স সরাসরি এয়ারলাইন্সের আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও দুই দেশের আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হলে কর্মীদের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়তে পারে। ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বে কর্মস্থলে যোগদান অনিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অস্থায়ী আবাসন ও অন্যান্য খরচের বোঝাও বাড়ে।

