দেড় মাসে ১০ চুরি
শাহ আমানতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে
Advertisement
এমএ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মণ্ডপ পরিদর্শনে গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এ উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রধানমন্ত্রী অবতরণের ১৬ ঘণ্টা আগেই বিমানবন্দর এলাকায় দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। চোরচক্র মাটির প্রায় তিন ফুট গভীর থেকে ৫০০ মিটার বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি করে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার ছয় দিনেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, পেরিফেরিয়াল নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা টহলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিরি মধ্যেই আগামী ১ নভেম্বর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অডিটে আসছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর চার সদস্যের একটি দল। দলটি চার দিনব্যাপী বিমানবন্দরের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গত দেড় মাসে শাহ আমানতে ১০টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকার প্রধান প্রবেশপথ জাপানি গেট থেকে ভেরি হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ওমনি-ডিরেকশনাল রেঞ্জ (ভিওআর) নেভিগেশন স্থাপনার দিকে যাওয়ার সড়ক থেকে ৫০০ মিটার ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়। অথচ ওই দিনই বিমানবন্দর এলাকায় ৬১টি ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নতুন ক্যাবল বা তার স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছিল। চুরি হওয়া তারটি সড়কের বাতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য মাটির প্রায় তিন ফুট গভীরে স্থাপন করা হয়েছিল। তারটির আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। এর আগে গত আগস্ট থেকে রানওয়ের আলো, ট্রান্সফরমার, ভূগর্ভস্থ তার ও সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির একাধিক ঘটনা ঘটে। এসব সরঞ্জামের কিছু অংশ রানওয়ের অ্যাপ্রোচ লাইটিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। গত ২১ আগস্ট রানওয়ের ০৫ প্রান্ত থেকে একটি ট্রান্সফরমার, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ক্যাবল কিটসহ ভূগর্ভস্থ তার, রানওয়ের বাতি, লাইট বেস ও লুপিং ক্যাবল চুরি হয়।
২ সেপ্টেম্বর কার্গো গুদামের পশ্চিম সীমানা থেকে রানওয়ের ০৫ প্রান্তের দিকে প্রায় আধাকিলোমিটার নিরাপত্তা বাতির তার নিয়ে যায় চোরেরা। এতে ওই এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। একই রাতে ভিওআর নেভিগেশন এলাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও চুরির ঘটনা ঘটে। ৮ সেপ্টেম্বর রানওয়ের ২৩ প্রান্ত থেকে অ্যাপ্রোচ লাইটের দুটি ট্রান্সফরমার এবং প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ক্যাবল কিট চুরি হয়। ১০ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার নিয়ে যায় চোরেরা।
১৩ সেপ্টেম্বর বোট ক্লাবের কাছে ছয়টি ট্রন্সফরমার এবং অ্যাপ্রোচ লাইটের বিভিন্ন ক্যাবল কিট চুরি হয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও তার এবং ৬ অক্টোবর আরও পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার চুরির ঘটনা ঘটে। ১০ অক্টোবর রাতে ২৩ প্রান্ত থেকে আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও তার চুরি হয়। সম্প্রতি ভিওআর এলাকা থেকে বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরির সময় মালামালসহ চোরচক্রের এক সদস্যকে হাতেনাতে আটক করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। পরে পুরোনো একটি মামলায় তাকে চালান দেওয়া হয়।
জানা যায়, শাহ আমানত বিমানবন্দর দেশের ‘ক’ শ্রেণির কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চারটি ইউনিট রয়েছে। এগুলো হলো-বেবিচকের নিরাপত্তা শাখা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), বিমান বাহিনীর টাস্কফোর্স ও আনসার। এসব ইউনিটের কার্যক্রম সমন্বয় করে বেবিচকের নিরাপত্তা শাখা। আর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখায় সাতজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারজন হলেন-তারেক জিয়াউদ্দীন সজিব, বাদশা ফয়সাল, পলাশ সাহা ও রাশেদুল ইসলাম। এই চারজন নিয়োগ পেয়েছেন ২০২৩ সালে। তাদের মধ্যে তারেক জিয়াউদ্দীন সজিব প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে আসন্ন আইকাও নিরাপত্তা অডিটের চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হলেন বাদশা ফয়সাল।
অভিযোগ রয়েছে, এই চারজন একই ব্যাচের হওয়ায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও চেইন অব কমান্ড নেই। এছাড়া বাকি তিনজন চলতি বছরের শুরুতে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে নিরাপত্তা শাখার সাত কর্মকর্তার কেউই এখন পর্যন্ত শিক্ষানবিশ পর্যায় অতিক্রম করতে পারেননি। চেইন অব কমান্ড না থাকায় এবং অভিজ্ঞতার অভাবে একের পর এক চুরির ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে পতেঙ্গা থানার ওসি পারভেজ আলী বলেন, ‘বিমানবন্দর এলাকায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। অন্য কেউ গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের জানানো হলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তাছাড়া বিমানবন্দর এলাকায় চুরির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
শাহ আমানতের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আইকাও অডিটে কাগজে-কলমে থাকা প্রটোকলের চেয়ে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। শাহ আমানত বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা থেকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ জন্য অডিট কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হতে হবে শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তাদের।’
বেবিচক সূত্র জানায়, আগামী ১ নভেম্বর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অডিট শুরু করবে চার সদস্যের আইকাও অডিট টিম। এই টিমে রয়েছেন-ক্যালাম ভাইন, আলেসান্দ্রা জোহানা অ্যারেনাস, শেখ আবদুল্লাহ বিন আব সুকর ও পিএ জয়কণ্ঠ। ৪ নভেম্বর অডিট কার্যক্রম শেষে তাদের বিমানবন্দর ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
জানতে চাইলে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নুর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘আইকাও অডিট সামনে রেখে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে হেডকোয়ার্টার থেকে প্রি-অডিটে যে কয়টি পয়েন্ট দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে। চুরির ঘটনাগুলো এয়ারসাইটের বাইরের ঘটনা। সেগুলো নিয়ে অডিট টিমের আপত্তি হওয়ার কথা নয়। তবে চুরির ঘটনার পর এয়ারসাইটের আশপাশের ঘাস ও ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে।’
