জামায়াত এমপির ভিডিও নিয়ে তোলপাড়
দল থেকে বহিষ্কার নজরুল ঝুঁকিতে এমপি পদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিকস্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত।
এদিকে, দলীয় একজন সংসদ-সদস্যের এমন অনৈতিককাণ্ডে অস্বস্তিতে পড়েছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এদিকে অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ ও ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা হয়েছে।
তবে দল বহিষ্কার করায় তার সংসদ-সদস্য পদ থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনজ্ঞ ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সংসদ-সদস্যকে দলীয়ভাবে বহিষ্কার করলে তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সংবিধান ও আইনে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই।
তবে যে দলের মনোনয়নে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলই তাকে বহিষ্কার করায় আইনের স্পিরিট অনুযায়ী তার সংসদ-সদস্য পদ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদিও তার বিষয়ে সংসদ-সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।
তবে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ-সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অবশ্য একটি সূত্রের দাবি, গাজী নজরুলকে পদত্যাগ করার জন্য দল থেকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি যেন নিজেই পদত্যাগ করেন।
সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ-সদস্যকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। এতে জামায়াতের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ওই তথ্য জানানো হয়। গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিওকে কেন্দ্র করে জামায়াতের মধ্যে বিতর্ক এখন তুঙ্গে বলে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন একই দলের যশোর-৫ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক। মঙ্গলবার রাতে ‘থিংকট্যাংক’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়া একটি অডিও বক্তব্যে সংসদ-সদস্যের গোপনে বিয়ে করার বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য, বৈধ ও সুন্নতসম্মত কোনো কাজ গোপনে হওয়ার কথা নয়।
গাজী এনামুল হক বলেন, বৈধ কাজ হয় প্রকাশ্যে, আর অনৈতিক কাজ হয় গোপনে। উনার এই বিয়েটাকে আপনারা সুন্নত বলে চালিয়ে দিচ্ছেন! একটি বিবাহে একজন নারী ও একজন পুরুষের চুক্তিতে যা যা থাকে, পতিতালয়েও একই কাজ হয়, সেখানেও অর্থের লেনদেন ঘটে। তবে পতিতালয়ের কাজ হারাম, আর বিবাহ হলো সুন্নত, যা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি হিন্দুরাও ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করেন।
আইনে স্পষ্ট নয় তবুও ঝুঁকি : দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ-সদস্য পদ ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করছেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী এ সংসদ-সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করার কারণেই তার সদস্য পদ বাতিল বা শূন্য ঘোষণার সরাসরি বিধান নেই।
তবে কারও সংসদ-সদস্য পদ নিয়ে বিতর্ক উঠলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬, ৬৭ ও সংসদ-সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাবে। তখন ইসি শুনানি ও বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে রায় দেবে।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেউ যদি দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন বা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেন, শুধু তখনই তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিল হবে। আর সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি অযোগ্য বিবেচিত হন এবং তিনি যদি নিজ দলের বিপক্ষে অবস্থান নেন তাহলে তার পদ শূন্য ঘোষণার বিধান রয়েছে। কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়া, নৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া বা সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার কারণে সংসদ-সদস্য পদ বাতিলের সরাসরি বিধান সংবিধানে নেই বলেও মত তাদের।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, স্পিকারের কাছ থেকে চিঠি আসুক। আমরা আইন ও বিধিবিধান খতিয়ে দেখব। এরপর সিদ্ধান্ত নেব। তবে তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিল হবে না-এমন শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মূল পরিচয় ও আইনি ভিত্তি তৈরি হয় দলগত কাঠামোর ওপর ভর করে। তাই দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করে তাহলে তার আসন শূন্য হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এটাই চূড়ান্ত মত নয়। কারণ বিষয়টি আইন ও আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আইনগত দিক থেকে বহিষ্কার করলেই সংসদ-সদস্য পদ যাবে না। এক্ষেত্রে পদত্যাগ করলে সংসদ-সদস্য পদ যাবে।
আইনজ্ঞদের মতে, নৈতিকস্খলনজনিত কারণে অযোগ্য হওয়ার বিধান রয়েছে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে ও আরপিওর ১২ ধারায়। এর একটি হলো নৈতিকস্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। গাজী নজরুল ইসলাম আইনগতভাবে এখনো দণ্ডপ্রাপ্ত হননি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দল থেকে বহিষ্কারের কারণে এর আগে কয়েকজনের সংসদ-সদস্য পদ বহাল থাকার নজির রয়েছে। এর একজন হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে তাকে ২০১৪ সালে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ। তার সংসদ-সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে স্পিকার নির্বাচন কমিশনকে চিঠিও দিয়েছিল। ওই চিঠির প্রেক্ষিতে তাকে শোকজ করা হয়। পরে তিনি সংসদে বক্তব্য দিয়ে নিজেই পদত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ্যমাধ্যমে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, এ প্রক্রিয়ায় তার সংসদ-সদস্য বাতিল করা যায় না।
চিঠির কারণে অস্বস্তি : এদিকে, সংসদ-সদস্যের ভিডিও ভাইরাল ছাড়াও একটি সার্কুলারকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ১২ জুলাই দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত জেলা ও মহানগরী আমিরদের কাছে একটি চিঠি দেন। এতে দলের রোকন হওয়া ও থাকার বিষয়ে তিনি একটি নির্দেশনা দেন। যার মর্মার্থ হলো; নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুরুষ এবং পুরুষদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীরা চাকরি করতে পারবেন না।
ওই চিঠি নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের অনেকেই উৎকণ্ঠা জানিয়ে যুগান্তরকে বলেছেন, দেশজুড়ে হাজারো জামায়াত নেতাকর্মী বর্তমানে গার্লস স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। অন্যদিকে, অনেক নারী নেত্রী-কর্মী রয়েছেন যারা বয়েজ (ছেলেদের) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। শুধু দলীয় আদর্শ ধারণ ও নির্দেশনা মেনে চলার জন্য যদি নিজেদের চাকরি ও জীবিকার পথ পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে। তারা বলেন, ইতোমধ্যে যেসব পুরুষ সদস্য (রোকন) গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজ অথবা মহিলা মাদ্রাসায় চাকরিরত রয়েছেন, তাদের সদস্যপদ (রুকনিয়াত) মুলতবি ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে। অনেক জেলা শহরে নেতাকর্মীদের ‘চাকরি ছাড়ুন না হয় দল ছাড়ুন’ এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে ফেলা হচ্ছে। একই অবস্থা নারী সদস্যদেরও; যারা বয়েজ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত, তারাও একই সংকটে পড়েছেন। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে এই ‘অমানবিক ও অযৌক্তিক’ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এ চিঠির সত্যতা স্বীকার করে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যুগান্তরকে বলেন, এটা নতুন কিছু নয়, পুরাতন সিদ্ধান্ত। নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যারা রুকনিয়াতের শপথ নেবেন, নৈতিকতা ও আদর্শিক মান ধরে রাখতেই জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত। তবে এটা স্টাফদের জন্য এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।
