Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

লক্ষ্য থেকে কত দূরে বাংলাদেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর : বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লক্ষ্য থেকে কত দূরে বাংলাদেশ

গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জনতার উচ্ছ্বাস -ফাইল ফটো

Advertisement

‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা; কোটাপ্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক; আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’-এরকম স্লোগানের মধ্য দিয়ে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কিন্তু ওই বর্ষা বিপ্লবে যখন শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের শত শত নিরস্ত্র মানুষ জীবন দিচ্ছিল, মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকার যখন রীতিমতো হোলি খেলছিল; তখন একপর্যায়ে এসে তা সরকার পতনের একদফায় রূপ নেয়। এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রক্তাক্ত ৩৬ জুলাই। চব্বিশের ৫ আগস্ট। অবিশ্বাস্য পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। দুপুরের খাবার ফেলে জীবন বাঁচাতে গণভবন ছেড়ে হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমানে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। 

এদিকে ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনা কোটার বিরুদ্ধে হলেও বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে শেষের দিনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন মেধাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা। একই সঙ্গে ইনসাফ তথা আইনের শাসন নিশ্চিত করে হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের টানা দুঃশাসনের কবর রচনা করা। এভাবে ভবিষ্যতে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল দেশের কোটি কোটি আমজনতা। ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিজয় যখন সুনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তিও নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ গ্রহণ করে। কিন্তু আজ গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর সব আশা যেন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। অনেকে মনে করছেন, স্বপ্নের সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ আজ অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এও মনে করেন, দেশকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে যথেষ্ট সদিচ্ছা ও দেশপ্রেম বিদ্যমান।

এ বিষয়ে কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুগান্তরকে জানিয়েছেন, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন, সারা জীবনের জন্য অন্ধ ও পঙ্গুত্ববরণ করে নিয়েছেন, তাদের প্রত্যাশার সেই বৈষম্যহীন মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ কোথায়। জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, তা সেভাবে বাস্তবায়ন হতে আমরা দেখছি না। বরং নির্বাচিত সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও আর্থিক সেক্টরসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে মেধা ও যোগ্যতার বাইরে দলীয় ও ব্যক্তি পছন্দের বিবেচনাকে প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত স্থবির। এককথায়, হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের অনেক কিছু এখন উঁকি দিতে শুরু করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ অনেকটা হতাশ।

তারা বলেন, বিএনপি সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তো সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অকপটে বলেই ফেলেছেন-আমি দেখছি ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি, ঘুসখোর আগের মতোই ঘুস খাচ্ছে। একইভাবে যারা ভালো কাজ আটকে দিত, তারা আবার সেটিই করছে। একইভাবে ভোল পালটাচ্ছে। ওরাই অনেক বেশি ‘জুলাই যোদ্ধা’। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সমাজের সর্বস্তরে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়ন হবে। এ লক্ষ্য ধারণ করবে বলে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি অনুসরণ করছে না, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভালো হবে না। তিনি মনে করেন, জুলাই যোদ্ধাদের যে প্রত্যাশা ছিল, তা থেকে আমরা যদি সরে আসি, তাহলে দিন শেষে কেউ ভালো থাকতে পারবে না। দেশের আরও অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। 

কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র নামে শেখ হাসিনা সরকার মেধার পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে সমাজের সর্বস্তরে দলীয়করণ ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল। যার পরিণতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিশ্ব দেখেছে। অপরদিকে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখায় ‘মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হবে’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন এখন পর্যন্ত সেভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নের পরিবর্তে অনেক স্থানে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পছন্দের লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। 

তারা বলেন, যে লক্ষ্য নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যোগ্যদের অবমূল্যায়ন এবং জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ধারণ করতে ব্যর্থ হলে সরকার বা বিরোধী দল কারও জন্যই তা ভালো হবে না। কোটায় নিয়োগকে কেন্দ্র তৎকালীন অসীম ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলে আবারও জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। 

তারা মনে করেন, জুলাই কিন্তু দেশের মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের আগুন ভালো করে জ্বালিয়ে দিতে পেরেছে। মানুষ শিখে গেছে কীভাবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হয়। ফলে ছাত্র-জনতাসহ সাধারণ মানুষের আন্দোলন আর আটকে রাখা যাবে না। বিশেষ করে এই ভার্চুয়াল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় একটি শক্তি। মেইন স্টিম মিডিয়ার বাইরে জনমত গঠনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এজন্য এ অঞ্চলের সব শাসককে জেন-জি ও আলফাদের চোখ রাঙানি আরও অন্তত তিন দশক সহ্য করতে হবে। 

সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। জুলাই আন্দোলনের সুফল হিসাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের নামে ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালে কারসাজি দেখেছি। এখন স্থানীয় সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করতে দেখেছি। নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। জনগণের কাছে তাদের প্রতিশ্রুতি থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাটা খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের আইনে সংস্কার এনে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া দরকার। 

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন বলেন, দেশকে ভালোভাবে সঠিক পথে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বত্র ইনসাফ কায়েমসহ মেধার মূল্যায়ন করতে হবে। শেখ হাসিনা মেধার মূল্যায়ন না করে দলীয় ব্যক্তিদের বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন করায় পুরো সিস্টেম লস হয়ে গেছে। দলীয় কোটায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা ক্ষমতার দাপট ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল। তখন মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়নি, দেশও সেভাবে আগাতে পারেনি। উলটো দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে গেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আজও সে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শেষমেশ এর পরিণতি সবাই দেখেছে। 

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এখনো যদি একই চিত্র দেখা যায়, তাহলে তা হবে বড় দুর্ভাগ্যজনক ও হতাশাজনক। সরকারের বিভিন্ন স্তরে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের যথেষ্ট মেধা ও যোগ্যতা না থাকলে দেশ সঠিকভাবে এগোবে না। কোনো দলীয় ভিত্তিতে নয়, কাউকে ট্যাগিং করে নয়-মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে সঠিক অর্থে জুলাই বিপ্লবের মূল্যায়ন হবে। 

রোকন উদ্দিন রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কারকদের সতর্ক করে বলেন, আমরা আরেকটি জুলাই বিপ্লব দেখতে চাই না, আবারও এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু দেখতে চাই না। আমরা চাই, সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। যেখানে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সরকার সক্রিয় ও আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেবে।


Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

জুলাইয়ে শিক্ষার্থী হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক ডিআইজি হামিদুল গ্রেফতার

জুলাইয়ে শিক্ষার্থী হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক ডিআইজি হামিদুল গ্রেফতার

মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যা, ২৬ আসামির চার্জ গঠনের আদেশ পেছাল

মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যা, ২৬ আসামির চার্জ গঠনের আদেশ পেছাল

ঝটিকা মিছিল থেকে অনলাইন তৎপরতা, পুলিশের ভেতরের যোগসাজশও খুঁজছে সরকার

ঝটিকা মিছিল থেকে অনলাইন তৎপরতা, পুলিশের ভেতরের যোগসাজশও খুঁজছে সরকার

অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া চালক সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার

চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলন অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া চালক সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার

আ.লীগের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আস্ফালন মেনে নেওয়া যায় না: রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল

আ.লীগের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আস্ফালন মেনে নেওয়া যায় না: রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল

বিএনপি নেতা ইসহাক হত্যা মামলায় শাহজাহান ওমর শ্যোন অ্যারেস্ট

বিএনপি নেতা ইসহাক হত্যা মামলায় শাহজাহান ওমর শ্যোন অ্যারেস্ট

আরও পড়ুন

তারেক রহমান-সানায়ে তাকাইচি বৈঠক সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়

সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া

বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া

যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড়

যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড়

নিরাপত্তাঝুঁকিতে শাহজালালের এয়ারসাইড কোনো নির্দেশনাই মানছে না এয়ারলাইন্সগুলো

কোনো নির্দেশনাই মানছে না এয়ারলাইন্সগুলো

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম