পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ
পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ
পুলিশ কেন ধাওয়া দেবে, এটা হাস্যকর-বাবা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কেএম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তার বন্ধু স্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় নদীর সীমানা প্রাচীরের ২৯ নম্বর পিলারের কাছে পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তি তাদের ধাওয়া দিলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন।
আর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে তার দেওয়া এসব তথ্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। শুক্রবার দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। এদিকে তাহসিফের বাবা বলেছেন, ‘পুলিশ কেন তাহসিফকে ধাওয়া দেবে, এটা হাস্যকর না? একজন সাবেক ডিফেন্স অফিসারকে কেন পুলিশ ধাওয়া করবে।’
এর আগে বুধবার দুপুরে উত্তরখান থানাধীন তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য সন্ধ্যায় তার লাশ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নেওয়ার সময় তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েত করিম হেলাল গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কেননা তার ছেলে সাঁতার জানত। ফলে নদীতে পড়ে তার মৃত্যু হতে পারে না। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বন্ধু (ছোট ভাই) আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে বের হয়েছিল তাহসিফ। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনো মামলা করেনি পরিবারটি। অন্যদিকে তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। এরপর রাতে দীপের তথ্যমতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার হোন্ডাগলি থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পরে শুক্রবার সকালেও দীপকে নিয়ে টঙ্গী মাজার বস্তি, তাহসিফ যেখান থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল সেই স্থান এবং তার লাশ উদ্ধার হওয়া তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন সংস্থাটির অতিরিক্ত ডিআইজিসহ একাধিক কর্মকর্তা।
পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বলেছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে তারা প্রথমে তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য একটি ওয়ার্কশপে যান। পরে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। রাত ১টার দিকে টঙ্গীর দিকে যাওয়ার পথে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের র্যাম্প দিয়ে নামার সময় তাহসিফ মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে যান। পরে মোটরসাইকেলটি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার হোন্ডাগলিতে রেখে তারা নদীর পাড়ে যান।
দীপের দাবি, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় নদীর সীমানা প্রাচীরের ২৯ নম্বর পিলারের কাছে অবস্থানকালে পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। আর দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে ধাওয়াকারীরা কারা ছিলেন, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কি না এবং কী পরিস্থিতিতে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তা তদন্ত করে দেখছে পিবিআই।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। দীপ বলেছে, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তার এ বক্তব্য কতটা সত্য, তা তদন্তের পর জানা যাবে।
পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীপকে সঙ্গে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। ঘটনার রাতে তারা যেসব স্থানে গিয়েছিলেন, সেসব এলাকা ঘুরে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার নদীর পাড় এবং তাহসিফের লাশ উদ্ধারের স্থান রাজাবাড়ী ঘাট এলাকাও পরিদর্শন করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। ঘটনার আগে ও পরে তাদের অবস্থান, চলাফেরা এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তিনি বাসায় ফেরার কথা জানান। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরদিন বুধবার দুপুরে উত্তরখান থানাধীন তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাহসিফের সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসাবে শনাক্ত করেন। ফুটেজে মঙ্গলবার রাতে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাদের দেখা হয়। তারা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান। তাহসিফের মোটরসাইকেলে কোনো নম্বর প্লেট ছিল না। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটিতেও নম্বর প্লেট পাওয়া যায়নি।
এদিকে বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। জানাজা শেষে উত্তরায় তাকে দাফন করা হয়েছে।
এই ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে উত্তরখান থানার পরিদর্শক (অপরেশন) শুব্রত। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মামলার বিষয়ে সকালে তাহসিফের বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন আসবেন। তবে এখনো তিনি আসেননি।
মামলার বিষয়ে জানতে তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েত হেলালের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে একটি সংবাদ মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, মর্মান্তিক এ ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করে বাড়তি আইনি ঝামেলায় জড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
কোনো ডিফেন্স অফিসার বা পুলিশের বিরুদ্ধে দোষারোপ কিংবা আইনি পদক্ষেপ নেওয়াকে তারা অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন। এ বিষয়ে পরিবার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে তারা আশা করেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ঘটনাটি খতিয়ে দেখবে।
তিনি বলেন, তাহসিফ একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। তার আত্মহত্যার কোনো কারণ নেই। পেশায় পাইলট তাহসিফ দেশের জন্য একটি বড় সম্পদ ছিলেন। পরিবারের প্রত্যাশা, সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
