বিশ্ব নগর দিবস আজ
বাড়ছে শহর কমছে স্বস্তি
Advertisement
বিশ্ব নগর দিবস আজ। পর্যাপ্ত জলাশয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ না থাকায় দিন দিন নগরজীবন হয়ে উঠছে অসহনীয়। ঢাকার গেন্ডারিয়ায় অট্টালিকার পাশাপাশি বিশাল পুকুরের দৃষ্টিনন্দন ছবিটি সম্প্রতি তোলা -খালিদ হোসেন কিরন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় ৩৮ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন আনিসুর রহমান। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনেক পরিবর্তন দেখেছেন নিজের চোখে। শুরুতে তিনি যে ঢাকার চেহারা দেখেছেন আজ সেই ঢাকা অচেনা। মানুষ গিজগিজ করছে। কোনো কিছুতে আর আগের মতো প্রশান্তি নেই।
আনিসুর বলেন, ‘মানুষের দেহ আছে যেন প্রাণ নেই। অতি নগরায়ণের ফলে আজ মেগা সিটি ঢাকার অবস্থা তাই হয়েছে। মনে হয়, রুটি-রুজির নিশ্চয়তা থাকলে আবার গ্রামে ফিরে যেতাম। শুধু আনিসুর একা নন, এমন অসংখ্য মানুষ এই অপরিকল্পিত মহানগরে শ্বাস নিতে না পেরে পালানোর পথ খুঁজছেন। কিন্তু জীবন-জীবিকা তাদের আটকে দিচ্ছে। অগণিত সমস্যা এই নগরে। তারপরও নগরায়ণ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্য প্রান্তরে। বড় শহরের বাইরেও গড়ে উঠছে নতুন বসতি। অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
শহরগুলো আয়তনে, জনসংখ্যা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে বড় হচ্ছে। এমনকি উপজেলা সদর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘিরে বাড়ছে আবাসন। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় নগরের সংখ্যা প্রায় ৫৭০টি। এর বাইরে গ্রোথ সেন্টার গড়ে উঠেছে প্রায় ২ হাজার ১০০টি। এসব জায়গায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি গড়ে উঠছে মানুষের বসতি। বহুতল ভবন। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠছে না পরিকল্পিত অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা। কোথাও আগাম পরিকল্পনার ঘাটতি আবার কোথাও পিছিয়ে বিদ্যমান পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের যাতায়াত, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও পরিবেশে। নগরায়ণের এই পরিবর্তন শুধু নতুন শহরের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না।
বিদ্যমান ছোট শহরের চারপাশে বসতি ছড়ানো, কৃষি জমির ব্যবহার বদল এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক সীমানা অপরিবর্তিত থাকলেও একটি শহরের প্রভাব আশপাশের ইউনিয়ন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ফলে পুরোনো এলাকার পাশাপাশি নতুন বসতির সড়ক, পানি, বর্জ্য ও নিষ্কাশনের চাহিদাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন তারা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দেশের নগরগুলোতে অনেক সমস্যা রয়েছে। বর্তমান সরকার নগরের সমস্যাগুলো সমাধানোর বিষয়ে আন্তরিক। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নগরাঞ্চলসহ সারা দেশের পরিকল্পিত উন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। গ্রামেও পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন হলে, সেখানে কর্মসংস্থান ঘটবে, শহরমুখী চাপ কমবে। আর শহরের উন্নয়নেও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষক জ্যঁ পেমসে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ নিয়ে তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের নগরের বিস্তার ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগের মিল থাকছে না। বিভিন্ন সংস্থার খণ্ডিত পরিকল্পনা, কেন্দ্রনির্ভর বাজেট এবং স্থানীয় সরকারের সীমিত ক্ষমতা নগরের বৃদ্ধি পরিচালনায় বাধা তৈরি করছে।
এমন বাস্তবতায় আজ (৩১ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব নগর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য-‘নগরের পুনরুজ্জীবন : সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন’। জাতিসংঘের মানববসতি কর্মসূচি বা ইউএন-হ্যাবিট্যাট নগর উন্নয়নে আবাসন, অবকাঠামো এবং বাসিন্দাদের স্বার্থকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়েছে। যদিও দিবসটি জাতীয়ভাবে বাংলাদেশে পালন করা হচ্ছে না। তবে বেসরকারিভাবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আলোচনা সভার আয়োজন করবে।
বাড়ছে নগর : বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২০) দেশে প্রায় ৫৭০টি নগরকেন্দ্রের কথা উল্লেখ রয়েছে। নথির মুদ্রিত ৪৬২ পৃষ্ঠায় বড় নগরের পাশাপাশি ছোট শহরের কথাও বলা হয়েছে। একই পরিকল্পনায় বিদ্যমান নগরের ভৌগোলিক সম্প্রসারণ, গ্রামীণ এলাকার নগর হিসাবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস এবং অভিবাসনকে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে সরকারের সামাজিক সুরক্ষাসংক্রান্ত এক নীতিসংক্ষেপে বলা হয়েছে, নগর জনসংখ্যার অংশ ২০১১ সালের ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে। তবে সীমানা ও শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তন থাকায় এই বৃদ্ধি গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন বলা যাবে না।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ছোট প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার চিত্র রয়েছে। অন্যদিকে বড় ও বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। গাজীপুর, মাধবদী, নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় কর্মসংস্থানের কেন্দ্র গড়ে উঠছে। অর্থাৎ নগরায়ণের সঙ্গে শিল্প, বাজার ও পরিবহণ যোগাযোগের সম্পর্ক বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক নগর রয়েছে। এগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। দেশ স্বাধীনের পর যেমন একটা সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, তেমনিভাবে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ভৌত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার ছিল। সেখানে সামগ্রিক উন্নয়নের নির্দেশনা থাকত। তার আলোকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। কিন্তু সেটা কোনো সরকার করেনি। তার খেসারত এখন পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে এযাবতকালে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানগুলো কাগজে পরিকল্পনা হয়ে আছে। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার বাইরে একই চ্যালেঞ্জ : বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৩-২০২২ সময়ে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ এবং নরসিংদী ও আড়াইহাজারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অথচ পরিবহণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নগর অবকাঠামোয় সমন্বিত বিনিয়োগ পিছিয়ে। বিনিয়োগ ও নগরের বাস্তব বৃদ্ধির এই অসংগতি পরিবহণ ব্যয় বাড়ায়, উৎপাদনশীলতা কমায় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
অপরদিকে, চট্টগ্রামেও বৃহত্তর নগর এলাকার জন্য পরিকল্পনার কাজ চলছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যে ২০২৫-২০৫০ মেয়াদি খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে মতামত গ্রহণ করা হয়। একটি গবেষণায় সিলেটের ক্ষেত্রে আরও নির্দিষ্ট প্রভাব উঠে এসেছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এসএনভির গবেষণা অনুযায়ী, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাভূমি হারানো এবং পানি মাটিতে প্রবেশে বাধা দেয় এমন পাকা এলাকার বিস্তার প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি ধারণের সক্ষমতাও কম। এতে নগরের বন্যাঝুঁকি বেড়েছে।
পরিকল্পনা আছে বাস্তবায়নে প্রশ্ন : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) রয়েছে। সরকারি বিবরণে পানি নিষ্কাশন উন্নয়ন এবং বন্যা প্রবাহের এলাকা দখল থেকে রক্ষার লক্ষ্য আছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঢাকার প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দার পাইপভিত্তিক পয়োনিষ্কাশন সংযোগ রয়েছে। আরও প্রায় ২ শতাংশ কার্যকর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করে। অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে অথবা বন্ধ হয়ে আছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পবৃদ্ধির তুলনায় দূষণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা পিছিয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজউক নিয়ে টিআইবির ২০২০ সালের গবেষণায় আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং উন্নয়নকারী ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় স্বার্থের সংঘাত উঠে আসে। তবে এটি বর্তমান ড্যাপের বাস্তবায়নের হার নির্দেশ করে না।
ছোট শহর ও বাজারকেন্দ্র : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকাশনার তালিকায় শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, সখীপুর, হাজীগঞ্জসহ বহু পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। শ্রীপুরের পরিকল্পনায় কৃষি এলাকা এবং পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের জন্য পুকুর, নদী সংরক্ষণের নীতি আছে। সখীপুরের পরিকল্পনায় পরিকল্পনা শাখা ও নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি তা অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এলজিইডির প্রকাশিত পুরোনো হিসাবে দেশে ২ হাজার ১০০ গ্রোথ সেন্টারের উল্লেখ রয়েছে।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের (ইউডিডি) পরিচালক ড. মো. মাহমুদ আলী যুগান্তরকে বলেন, ১৯৬৫ সালে ইউডিডি গঠিত হলেও মূল কাজই করতে পারেনি। এযাবতকাল মাস্টারপ্ল্যান করা হলেও তার বাস্তবায়নে শাস্তির বিধান ছিল না। বর্তমান সরকারের সময়ে সেই আইন করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাইরে এলাকার জন্য ১০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এগুলো প্রণয়নের পাশাপাশি সব মাস্টারপ্ল্যানের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের নগরগুলোর বাসোপযোগিতা বাড়বে।

