রাজধানীর রেললাইনজুড়ে মাদকের অবাধ কারবার
Advertisement
কাওরান বাজার রেললাইন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা। বুধবার তোলা -রফিকুল ইসলাম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর রেললাইন যেন মাদক বিক্রির উন্মুক্ত বাজার। সকাল থেকে গভীর রাত-কোথাও পলিথিনের ব্যাগে, কোথাও ছোট খুপরিতে চলছে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি ও সেবন। রেললাইনের পাশ দিয়ে চলাচল করলেই মাদক বিক্রেতাদের ডাক, ‘লাগবে নাকি?’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না এসব কারবার। অভিযান শেষ হলেই আবার ফিরে আসছে বিক্রেতা ও সেবনকারীরা। টঙ্গী থেকে কমলাপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জমুখী রেলপথের বিভিন্ন অংশে এমন চিত্র দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আট অপরাধ জোনে মাদক কেনাবেচার ২৪৭টি স্পট চিহ্নিত রয়েছে। এসব স্পট ঘিরে সক্রিয় ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং সাড়ে ৩ হাজারের বেশি কারবারি। মাদকের এই বিস্তার ঠেকাতে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো এবং সামাজিক উদ্যোগ জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ঢাকা-৬ আসনের সংসদ-সদস্য ইশরাক হোসেনের গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের পর রাজধানীর রেললাইনকেন্দ্রিক মাদক স্পটগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। এরপর এসব এলাকায় অভিযান জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে মাদক বিক্রি ও সেবনে জড়িত ব্যক্তিদের।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে স্থায়ীভাবে মাদক স্পটগুলো বন্ধের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
রেললাইনের দুই পাশেই মাদকের হাট : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও পাশের মুন্সিরটেক ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন রেললাইন ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদকের আস্তানা। টঙ্গী রেলস্টেশন থেকে কমলাপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যেতে রেললাইনের দুই পাশে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র চোখে পড়ে। গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনের পাশাপাশি কোথাও কোথাও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ংকর মাদকও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
পলিথিন কিংবা বাজারের ব্যাগে রাখা হয় মাদক। বিক্রেতাদের বড় একটি অংশ নারী। পুরুষদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও অভিযানের খবরাখবর রাখেন। মাদক কেনার পর সামান্য অর্থের বিনিময়ে রেললাইনের পাশের ছোট খুপরিতে বসে সেবনের সুযোগও দেওয়া হয়। ফলে বিক্রি ও সেবন-দুটিই চলছে একই এলাকায়।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, ডিএমপির আট অপরাধ জোনে ২৪৭টি মাদক স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ২৩১ জন ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং সাড়ে ৩ হাজারের বেশি কারবারি সক্রিয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব ডিলার ও কারবারিই রেললাইনকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।
ঘুণ্টিঘর থেকে গোপীবাগ, সায়েদাবাদ : গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন থেকে দয়াগঞ্জ লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত ঘুণ্টিঘর এলাকা মাদকের অন্যতম পরিচিত আস্তানা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেললাইনের দুপাশের খোলা জায়গা, পরিত্যক্ত ঘর এবং পলিথিন বা কাগজ দিয়ে তৈরি খুপরিতে গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইন কেনাবেচা এবং সেবন চলে। ইশরাক হোসেনের অভিযানের পর কয়েকদিন কারবারিদের উপস্থিতি কম থাকলেও পরে আবার ভাসমান মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। সরেজমিন বৃহস্পতিবারও সেখানে মাদক বিক্রি ও সেবন করতে দেখা গেছে।
সায়েদাবাদ ও গোপীবাগ এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, গোপীবাগ রেললাইন ও সুইপার কলোনিসংলগ্ন এলাকায় দিন-রাত মাদক কেনাবেচা হয়। সায়েদাবাদ ওভারপাসের নিচে এবং জনপদের মোড়সংলগ্ন রেললাইনের ফাঁকা জায়গায়ও বসে মাদকের আসর। শুক্রবার সরেজমিন এসব স্থানে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা গেছে। রেললাইন ধরে চলাচলকারী মানুষকে লক্ষ্য করে মাদক বিক্রেতাদের ‘লাগবে নাকি’ বলে ডাকতেও দেখা যায়।
খিলগাঁও এলাকায় রেলগেট, অতীশ দীপঙ্কর রোডসংলগ্ন রেললাইনের দুপাশ এবং খিলগাঁও লাইনে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, নারী-পুরুষ উভয়েই পলিথিনের ব্যাগে করে এসব মাদক বিক্রি করেন। ক্রেতা দেখেই অনেক সময় বিক্রেতারা তাদের চিনতে পারেন। ভাসমান মানুষের মাধ্যমেও মাদক কেনাবেচা চলে।
কাওরান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত একই চিত্র : কাওরান বাজারের পাইকারি বাজারের পেছনের রেললাইন এবং মগবাজার রেলগেট থেকে তেজগাঁও রেলস্টেশন পর্যন্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচার স্থান হিসাবে পরিচিত। ছোট খুপরি ও ফ্লাইওভারের নিচের অন্ধকার জায়গায় ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে নাখালপাড়া ও তেজকুনীপাড়ার দিকে নির্জন রেললাইনের পাশেও চলে মাদক কেনাবেচা ও সেবন।
সরেজমিনে কাওরান বাজার-নাখালপাড়া রেললাইন এলাকায় প্রকাশ্যে ডাকাডাকি করে মাদক বিক্রি করতে দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর এফডিসি রেলগেট এলাকায় কেউ পলিথিনে, কেউ বাজারের ব্যাগে করে মাদক বিক্রি করেন। রেললাইন ধরে কেউ হেঁটে গেলে তাকে ডেকে মাদক লাগবে কি না, জানতে চাওয়া হয়। এফডিসি রেলগেট থেকে তেজগাঁও রেলগেট এবং কাওরান বাজার থেকে তেজগাঁও রেলস্টেশন পর্যন্তও একই চিত্র দেখা গেছে। স্টেশনের আগে-পরে ভাসমান বস্তিবাসীর একাংশকে ডাকাডাকি করে মাদক বিক্রি করতে দেখা যায়।
মহাখালী রেলগেট ও সাততলা বস্তিসংলগ্ন রেললাইনেও চলে মাদক কেনাবেচা। কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচের রেললাইন, খিলক্ষেত লেভেল ক্রসিংয়ের আশপাশ, বিমানবন্দর রেলস্টেশনের উত্তর ও দক্ষিণ পাশ এবং কসাইবাড়ী রেলগেটসংলগ্ন এলাকায়ও মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দর স্টেশনের দুই পাশে পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট খুপরিতে সেবনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পাহারায় লোক, অভিযানে পালানোর পথ : সরেজমিন দেখা যায়, রেললাইনের সীমানাপ্রাচীর বা ঢালু জায়গায় প্লাস্টিক ও কাগজ দিয়ে ছোট ঘর তৈরি করে মাদকসেবনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মূল কারবারিরা রেললাইনের পাশে অবস্থান করেন। অন্যদিকে কিছু লোক দূরে থেকে পাহারা দেন। পুলিশ বা সন্দেহভাজন কারও উপস্থিতি দেখলে তারা সতর্ক করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে এক রেললাইন থেকে অন্য লাইনে কিংবা পাশের গলি দিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ থাকে তাদের।
রেললাইনের পাশে এসব অস্থায়ী আস্তানা এবং কারবারিদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের কারণে অভিযান চালিয়েও মাদক ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
অভিযানের পরও ফিরছেন কারবারিরা : ১৭ অক্টোবর গেণ্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন একটি বস্তির মাদক আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালান তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করা হয়। অভিযানসংক্রান্ত দুটি ভিডিও নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওতে ইশরাক ও তার এক সহযোগীকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিত ব্যক্তিদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ ঘটনার পর ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরদিন ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের কথা জানান ইশরাক।
এরপর মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে পুলিশ ও ডিএনসি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, ২১ অক্টোবর বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় স্টেশনের বাইরের মাদকের আখড়াগুলো ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ১৯ অক্টোবর ঘুণ্টিঘর এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজধানীতে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানও চলছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ঘুণ্টিঘর এলাকায় ছয় মাসে পাঁচ শতাধিক মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়েছে। ডিএমপি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং রেললাইনকেন্দ্রিক সব মাদক স্পট ধ্বংস করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, মাদকের মূলোৎপাটন করতে হলে সরবরাহের পুরো চেইন ভেঙে ফেলতে হবে। এজন্য মাদকের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু পুলিশ বা ডিএনসিসির পক্ষে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও সোচ্চার হতে হবে। মাদকাসক্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীর মাদকের হটস্পট এবং রেললাইনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোয় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে অনেক কারবারি ও সেবনকারীকে গ্রেফতার করা হলেও জামিনে বেরিয়ে তাদের অনেকে আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। তবে মাদক কারবারে যেই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

