Logo
Logo
×

Advertisement

বিচ্ছু

রম্যগল্প

স্মার্ট ফ্রিজ ও ফ্রোজেন শাশুড়ি

Advertisement

Icon

রফিকুল ইসলাম কামাল

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রযুক্তির প্রেমে পড়ে গত মাসে কিস্তিতে একটা ‘স্মার্ট ফ্রিজ’ কিনে আনলাম। কাচের দরজা, ভেতরের সব জিনিস বাইরে থেকেই দেখা যায়, ওয়াইফাই কানেক্টেড, আর দরজায় বিশাল এক টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে। ফ্রিজ কত ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলছে, ভেতরে কটা ডিম আছে-সব নোটিফিকেশন দেয়। বিপদটা শুরু হলো সম্প্রতি দেশে টানা লোডশেডিং শুরু হওয়ার পর।

আমাদের ফ্ল্যাটের জেনারেটর বেশ শক্তিশালী। বিদ্যুৎ গেলেই পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে জেনারেটর অন হয়ে যায়; কিন্তু এই ‘স্মার্ট’ ফ্রিজের ভেতরে একখানা অতিরিক্ত বুদ্ধিমান মাদারবোর্ড বসানো আছে। কারেন্ট গিয়ে জেনারেটর চালু হলেই সে ভাবে ‘নিশ্চয়ই লাইনে কোনো ডেঞ্জারাস ভোল্টেজ ফ্ল্যাকচুয়েশন হচ্ছে!’ ফলাফল? নিরাপত্তার খাতিরে ফ্রিজ নিজেকে নিজে ‘সেফ মোডে’ লক করে দেয়। আর লকিং সিস্টেমটাও অদ্ভুত-ভেতরের কুলিং বন্ধ করে সে বিকট শব্দে অ্যালার্ম বাজিয়ে সংকেত দেয়, ‘সতর্কতা! আপনার ফ্রিজের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে!’

গত মঙ্গলবার দুপুরে লোডশেডিং। জেনারেটর চলল, আর ফ্রিজও যথারীতি ভীতিপ্রদর্শন শুরু করল। ওদিকে আমার শাশুড়ি আম্মা গ্রাম থেকে এসেছেন। উনি অতশত বোঝেন না। ফ্রিজের ভেতরের ওই চকচকে কাচের দরজার পেছনে রাখা এক বাটি ঠান্ডা রসমলাই দেখে উনার মিষ্টির লোভ জেগে ওঠে। উনি গিয়ে সোজা ফ্রিজের হ্যান্ডেল ধরে কষে টান দিলেন। কিন্তু লকিং মোডে থাকা স্মার্ট ফ্রিজ কি আর সহজে খোলে? খোলার বদলে সে বিকট শব্দে হুইসেল বাজিয়ে বললো-‘সিকিউরিটি অ্যালার্ট! অননুমোদিত স্পর্শ শনাক্ত হয়েছে!’ এমন অ্যালার্মে শাশুড়ি আম্মা আতঙ্কে যেন জমে গেলেন। তিনি চিৎকার জুড়ে দিলেন, ‘ওরে বাবারে! তোদের এই আলমারি তো আমাকে দেখে গালি দিচ্ছে রে!’

আমি দৌড়ে ড্রয়িংরুম থেকে এসে ফ্রিজের টাচস্ক্রিনে ‘ক্যানসেল’ চাপতে গেলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, লোডশেডিং ও জেনারেটর চালুতে ভোল্টেজ ওঠানামার ধাক্কায় ফ্রিজের টাচস্ক্রিন হ্যাং করে বসে। স্ক্রিনে তখন বার্তা দিচ্ছে-‘সিস্টেম রিবুট হচ্ছে...অনুগ্রহ করে ৬০০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন।’ মানে দশ মিনিট! শাশুড়ি আম্মার চশমার আড়ালে তখন করুণ দৃষ্টি-রসমলাইয়ের বাটিটা কাচের ওপারে ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ধরা যাচ্ছে না! উনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘বাবা রফিক, এই জিনিস আমারে জীবনেও কমপ্লিট বিশ্বাস করবে না। আমি একটু মিষ্টি খাইতে গেলাম আর ও সারা পাড়া মাথায় তুলল! আমার চেয়ে ওই প্লাস্টিকের ডিব্বার ইজ্জত বেশি!’

আমি উনাকে শান্ত করতে পকেট থেকে ফোন বের করে অ্যাপের মাধ্যমে ফ্রিজ আনলকের চেষ্টা করলাম। কিন্তু ইন্টারনেট স্লো থাকায় অ্যাপ ঘুরছে তো ঘুরছেই। অবশেষে অ্যাপ একটা বার্তা দিল, ‘স্মার্ট ফ্রিজের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রিমোট আনলকের জন্য ফেস-আইডি স্ক্যান করুন।’ আমি ফোনের সামনে মুখ নিলে অ্যাপ থেকে বার্তা দিল, ‘চেহারা মিলছে না। আপনি কি সত্যিই রফিক?’ আমার ফ্রিজ আমাকেই চিনতে পারছে না! এবার শাশুড়ি আম্মা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন উনি ভাবছেন যে ফ্রিজ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে; আমি আসলে এক ছদ্মবেশী ডাকাত! উনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘থাক বাবা, আমার আর রসমলাই খাওয়া লাগবে না। ফ্রিজ তোমাকে চিনতে পারছে না, আর দুই মিনিট পর মনে হয় পুলিশে খবর দেবে!’

অবশেষে বিশ মিনিট পর যখন বিদ্যুৎ এল, ফ্রিজ নিজে থেকেই একটা মিষ্টি টুং-টাং শব্দ করে লক খুলল। শাশুড়ি আম্মা রসমলাইয়ের বাটিটা বের করে টেবিলে নিয়ে বসলেন, তারপর ফ্রিজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘শোনো বাপু ফ্রিজ, তুমি স্মার্ট হতে পারো, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে তুমি কিন্তু কাঠের আলমারির চেয়েও অধম!’ কথাটা শুনে ফ্রিজ যেন অপমানিত হলো! সে টুং শব্দে তার ডিজিটাল স্ক্রিনে বার্তা দিল, ‘দৈনিক ক্যালোরি নোটিফিকেশন: অতিরিক্ত মিষ্টি গ্রহণ বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে!’ শাশুড়ি আম্মা চামচ মাঝপথে থামিয়ে চোখ চড়কগাছ করে ফেললেন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওরে বাবারে! এটা ফ্রিজ নাকি জিন! আমার পেটের হিসাবও রাখে! আমি মিষ্টি খাব, তাতেও এই ভিনদেশি ডিব্বার চুলকানি কেন?’ আমি কপালে হাত দিয়ে বললাম, ‘আম্মা, ওটা ডায়েট রিমাইন্ডার...!’ ‘থাম তুমি!’ শাশুড়ি আম্মা আমাকে থামিয়ে দিয়ে এক ঝটকায় একটা টাওয়াল নিয়ে ফ্রিজের ডিসপ্লে এমনভাবে ঢেকে দিলেন, যেন অপরাধীকে কানপট্টি বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! কাজ শেষ করে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে উনি বললেন, ‘চোখ বেঁধে দিয়েছি, আমি কয়টা রসমালাই খেলাম আর দেখতে পারবি না! নে! এবার দে দেখি নোটিফিকেশন!’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মলাট বৃত্তান্ত হুমকিচক্র

হুমকিচক্র

রম্যগল্প স্মার্ট ফ্রিজ ও ফ্রোজেন শাশুড়ি

স্মার্ট ফ্রিজ ও ফ্রোজেন শাশুড়ি

অবান্তর প্রশ্ন যুগান্তর উত্তর

অবান্তর প্রশ্ন যুগান্তর উত্তর

একগুচ্ছ কৌতুক

একগুচ্ছ কৌতুক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম