Logo
Logo
×

Advertisement

বিচ্ছু

পাঠক রস

ইতিবাচক চিন্তা

Advertisement

Icon

রায়হান আহমেদ তামীম

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

আপনার বাসায় বিদ্যুৎ নেই? তার মানে আপনি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ! গতকাল বিকালে একটা প্রেস ব্রিফিং ডাকা হলো। ব্যানারে লেখা, ‘জাতীয় জ্বালানি সংকট ইতিবাচক ব্যবস্থাপনা সেল’। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। তিনি নিম্নে আলোচিত সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর একজন পিআর কর্মী। স্যুট-টাই পরা, হাতে একগুচ্ছ কাগজ। চোখেমুখে প্রবল আত্মবিশ্বাস। দেখে মনে হলো, দেশে বিদ্যুৎ-গ্যাসের কোনো সংকট নেই। বরং সংকটটা হচ্ছে, আমরা বুঝতে পারছি না যে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে।

ভদ্রলোক মাইক্রোফোন ঠিক করে বললেন, ‘আমরা জানি, দেশে বিদ্যুতের সংকট। গ্যাসের সংকট। কিন্তু আমরা এখানে দুঃখ প্রকাশ করতে আসিনি। আমরা একটা প্রতিবেদন নিয়ে এসেছি। এই পরিস্থিতিতে মানুষ যে কত রকম সুবিধা পাচ্ছে, আজ সেগুলোই আপনাদের জানাব।

০১. পারিবারিক অংশগ্রহণ সূচক বেড়েছে। যে সংসারে আগে এসি চলত চব্বিশ ঘণ্টা, সেখানে এখন হাতপাখা চলছে বারো ঘণ্টা। অর্থাৎ পরিবারের সবাই মিলে কাজে অংশ নিচ্ছে। স্বামী এখন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। স্ত্রীও স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাতপাখা চালাতে চালাতে একটু পরপর জিজ্ঞেস করেন, আর কতক্ষণ? আমরা এটাকে বলছি পারিবারিক যোগাযোগের পুনর্জাগরণ।

০২. ডিজিটাল ডিটক্স সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ওয়াইফাই রাউটার বন্ধ থাকায় পরিবারের লোকজন বাধ্য হয়ে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা এটাকে বলছি ফোর্সড কানেক্টিভিটি। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই কথাবার্তার প্রায় ৮৭ শতাংশের বিষয় বস্তু হচ্ছে, কারেন্ট কখন আসবে? আর বাকি ১৩ শতাংশে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছে, তোমার ফোনে চার্জ আছে? এটাও কিন্তু একটা অগ্রগতি!

০৩. এটাকে আমরা স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচিও বলতে পারি। ফ্যান বন্ধ, এসি বন্ধ, টেলিভিশন বন্ধ, ফ্রিজও মাঝে মাঝে বন্ধ। মানুষ চাইলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছে না। আমরা এটাকে বলছি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়।

একজন সাংবাদিক হাত তুললেন, ‘কিন্তু ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!’ পিআর কর্মী একটু থেমে বললেন, ‘দেখুন, আমরা এটাকে খাদ্য অপচয় হিসাবে দেখছি না। এটাকে বলা যায় ফ্রিজের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটা চেষ্টা।’

০৪. শিশুদের ঐতিহ্যবাহী বিনোদন পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। টিভি চলছে না, ওয়াইফাই বন্ধ থাকায় ইউটিউবও দেখা যাচ্ছে না, এমনকি মোবাইলেও চার্জ নেই। ফলে শিশুরা আবার লুডু, ক্যারাম আর পরিবারের লোকজনকে বিরক্ত করার মতো পুরোনো বিনোদনে ফিরে যাচ্ছে। আমাদের একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটা শিশু দিনে গড়ে তিনবার মাকে জিজ্ঞেস করছে, আম্মু, কারেন্ট কখন আসবে? কার্টুন দেখব। আমরা এটাকে বলছি জিজ্ঞাসু মানসিকতার বিকাশ।

০৫. জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রতিবেশী পর্যবেক্ষণে আগ্রহ বেড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। চাঁদ, তারা, মেঘ এসব নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তবে একটা বিষয় এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। মানুষ আসলে আকাশ দেখছে, নাকি পাশের বাসায় জেনারেটর চলছে কি না, সেটা দেখছে। এই দুইয়ের পার্থক্য বের করার জন্য আমাদের বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে।

০৬. ঘুমের শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, ফেসবুক কিছুই ঠিকমতো চলছে না। ফলে মানুষ রাত নয়টায় বিছানায় যাচ্ছে। এটা আমাদের দাদা-নানাদের বহু বছরের পরামর্শের বাস্তবায়ন।

একজন সাংবাদিক বললেন, ‘কিন্তু গরমে তো মানুষ ঘুমাতেই পারছে না।’ পিআর কর্মী বললেন, ‘ঘুম না আসাটাও খারাপ না। মানুষ এখন ঘুমানোর বদলে জীবন নিয়ে ভাবছে।’ তিনি একটু থেমে আবার বললেন, ‘আর মশা তাড়াতে গিয়ে শরীরচর্চাও হয়ে যাচ্ছে। মানসিক আর শারীরিক, দুই দিকেই উন্নতি হচ্ছে।’

০৭. গ্যাস সংকটের মাধ্যমে ধৈর্য উন্নয়ন। গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। আমরা এটাকে রান্নাঘরের সমস্যা হিসাবে দেখছি না। এটা আসলে জাতীয় ধৈর্য উন্নয়ন কর্মসূচি। আগে মানুষ হাঁড়ি চড়িয়ে রান্না হওয়ার জন্য অপেক্ষা করত। এখন হাঁড়ি চড়িয়ে গ্যাস আসার জন্য অপেক্ষা করে। খুব একটা পার্থক্য নেই।

একজন সাংবাদিক বললেন, ‘কিন্তু অনেক পরিবার তো রান্নাই করতে পারছে না।’ পিআর কর্মী মাথা নাড়লেন, ‘এটা ঠিক। তবে এতে মানুষ বিকল্প খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। যেমন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, আর পাশের বাসার রান্নাঘর।’

০৮. ব্যবসায় ক্ষতিরও ইতিবাচক দিক আছে। একজন সাংবাদিক এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যায় কারখানা বন্ধ থাকছে, উৎপাদন কমছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ পিআর কর্মী শান্তভাবে বললেন, ‘ক্ষতি হচ্ছে, সেটা আমরা অস্বীকার করছি না। তবে ক্ষতিরও একটা ভালো দিক আছে। ক্ষতি না হলে মানুষ বুঝত কীভাবে যে লাভ কত গুরুত্বপূর্ণ?’

সাংবাদিক বললেন, ‘তাহলে এটাকে কী বলা হচ্ছে?’

পিআর কর্মী বললেন, ‘তুলনামূলক অর্থনৈতিক সচেতনতা!’

ব্রিফিংয়ের শেষ দিকে একজন সাংবাদিক জানতে চাইলেন, ‘আপনার নিজের বাসায় কি বিদ্যুৎ আছে?’

এই প্রথম পিআর কর্মীকে একটু নার্ভাস মনে হলো। তিনি কাগজগুলো উলটেপালটে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘এই প্রশ্নটা আজকের আলোচ্যসূচিতে নেই।’

তিনি আবার মাইক্রোফোনের কাছে ঝুঁকে বললেন, ‘তবে এটুকু বলতে পারি, আমাদের সবারই সংকটকে একটু ইতিবাচকভাবে দেখার অভ্যাস করা উচিত।’ আরেকজন সাংবাদিক বললেন, ‘অনেকে রাতে গরমে ঘুমাতে পারছে না। অনেকে অফিসের কাজ করতে পারছে না। হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়িতে সমস্যা হচ্ছে। এসবের সমাধান কী?’

এবার পিআর কর্মী কাগজগুলো গুছিয়ে নিলেন, ‘দেখুন, সমাধান আমাদের কাজ না। সমাধান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজ।’

ব্রিফিং শেষ হলো করতালির মধ্য দিয়ে। তবে করতালিটা খুব জোরে হলো না। কারণ ততক্ষণে কারেন্ট চম্পট দিয়েছে। কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘ভাই, কারেন্ট কখন আসবে?’

পিআর কর্মীর উত্তর আর শোনা গেল না।

যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

‘পাখিরাজ্যে আমরা তো কখনো মানুষতাড়ুয়া বানাইনি’

‘পাখিরাজ্যে আমরা তো কখনো মানুষতাড়ুয়া বানাইনি’

পাঠক রস ইতিবাচক চিন্তা

ইতিবাচক চিন্তা

অবান্তর প্রশ্ন যুগান্তর উত্তর

অবান্তর প্রশ্ন যুগান্তর উত্তর

একগুচ্ছ কৌতুক

একগুচ্ছ কৌতুক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম