‘পাখিরাজ্যে আমরা তো কখনো মানুষতাড়ুয়া বানাইনি’
এত কিছু থাকতে বিচ্ছু আমাগো নিয়া পড়ল ক্যান? * বুঝছি, বিচ্ছু সম্পাদকরে সাইজ করতে হইব! * আপনাদের বলা হয় প্রকৃতির ঝাড়ুদার। অথচ আগের মতো আর ঢাকা শহরে কাক দেখাই যায় না। কোথায় গেল এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা? * বেতন-ভাতা দূরের কথা, এক টুকরা খাবারও কি দেওয়া হয়? ফ্রিতে আর কত? তাই সার্ভিস দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি!
Advertisement
শফিক হাসান
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রথম ও শেষ বিচারে কাকও একটা পাখি। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে-প্রাণিরাজ্যের কেউই তাকে পাখি বলে না। কেন এমন বৈষম্য? জবাব জানা নেই কারও। আশঙ্কার বিষয়-প্রকৃতি থেকে কাক কমে যাচ্ছে। ঢাকাও এখন অনেকটাই কাকশূন্য! মানে শোনা যায় না আগের মতো কা কা শব্দ। এ নিয়ে কাক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন ‘কাকস্য পরিবেদনা’পন্থি পক্ষীগবেষক
শফিক হাসান
* নগর ঢাকা থেকে কাক কমে যাচ্ছে। কেন?
** খুবই স্বাভাবিক। কাক তো আর মানুষ নয়, কচ্ছপ-কামড় দিয়ে পড়ে থাকবে! আপনি নিশ্চয়ই জানেন কয়েক বছর ধরে ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহর ঘোষণা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক জরিপে। এই শহর মনুষ্য-বসবাসের উপযোগী নয়। দেশে কাকশুমারি হয় না, তাই ঢাকা কাক-বসবাসের উপযোগী কিনা এমন জরিপ কেউই কখনো করেন না। এরপরও কি ঢাকায় বসবাস করার পক্ষে কাকেদের কোনো যুক্তি বা অবলম্বন থাকে?
* কাকেরা কোথায় যাচ্ছে তাহলে?
** পৃথিবী অনেক বড়। বড় বিষয়ে না গিয়ে আপাতত আপনার পরিচিত বুদ্ধিজীবী মণি আপার কথাই ধরি। মানুষ কী খাচ্ছে এখন? ফরমালিনসহ অনেক বিষাক্ত খাবার। মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেরাও দূষিত এখন। মনে-মননে-চরিত্রে। মানুষের কথা বাদ দিলে কাকেরা দূষিত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন ঘটাতে পারছে না। তার মানে দূষিত খাবার খেয়ে কাক সম্প্রদায় এখানে-ওখানে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। অথবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। সঠিক তথ্য জানি না।
* শীতকালে সাইবেরিয়া থেকে প্রচুর পাখি বাংলাদেশে আসে। কাকেরাও কি অন্য কোনো দেশে শরণার্থী হচ্ছে?
** প্রশ্নটা মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যাওয়ার জায়গা নেই বলে আপনারা নড়তে পারছেন না। মুখ বুজে থাকছেন। বিষ খেয়ে হজম করছেন। এ বিষয়ে মহাত্মা লালন কী যেন বলেছিলেন। তা আপাতত উচ্চারণ করতে চাই না। পরে হয়তো দেখা যাবে, অতি উৎসাহী লোকজন আমাদের ঢিল ছুড়ে মারবে। লালন ফকিরকে অজাত-বজ্জাত বলে খোঁটা দেবে!
* কাককে বলা হয় প্রকৃতির ঝাড়ুদার। কাকশূন্য অবস্থায় ঝাড়ু দেওয়ার কাজটা কে করবে?
** নিজেদের কাজ নিজেরা করলে সমস্যা কী? আর কতকাল অন্যদের খাটিয়ে সুখনিদ্রা যাবেন! কাককেই কেন প্রকৃতির ঝাড়ুদার হতে হবে? মানুষ কী করে তাহলে! আরেকটা নামও দিয়েছেন-‘প্রকৃতির অতন্দ্র প্রহরী’। বিশেষণের ছিরি দেখে লজ্জায় লাল হয়ে যাই। নোংরা-উচ্ছিষ্ট খাবার ছাড়া কখনো ভালো খাবার দিয়েছেন কাকেদের? দেওয়ার গরজ অনুভব করেছেন!
* মানুষ যদি বহুরূপী হয়, কাক কত-রূপী?
** মোক্ষম জবাবটা দিতে পারতাম। কিন্তু দেব না। আমরা শতরূপী নই। কাকের প্রকারভেদ না খুঁজে নিজেদের বংশগরিমা, ঠাঁটবাট, ফুটানি এসব কমিয়ে আনলে কী হয়? সামনে আপনার বিসিএস পরীক্ষা, তাই দয়াপরবশ হয়ে বলছি; কাক মূলত দুই প্রকার-দাঁড়কাক, পাতিকাক। আরেকটা কাক অবশ্য আছে-কাকতাড়ুয়া। ফসলি জমি থেকে অবাঞ্ছিত পাখি দূর করতে নাটকটা সাজান। কই পাখিরাজ্যে আমরা তো কখনো মানুষতাড়ুয়া বানাইনি। অন্যদের ধোঁকা দিইনি। তবে আপনারা কেন পাতিলের মুখে চুন-কালি লেপে ছেঁড়া পোশাক পরিয়ে ভুয়া অবয়ব দাঁড় করান!
* কাক ডিম পাড়ে কোকিলের বাসায়। কেন?
** মনুষ্য সম্প্রদায়ের মতো কোকিলরাও ফাজিল প্রাণী। এরা আমাদের নানাভাবেই নাকানিচুবানি খাওয়ায়। কৌশলে ফাঁদে ফেলে দেয় বলে কোকিলের বাসায় ডিম পাড়তে বাধ্য হই। অথচ কবি বলেছেন, কাঁচাঘর খাসা! মানুষও আজকাল কাঁচাঘর ত্যাগ করে শহরের বিল্ডিংগুলোতে ভাড়ায় থাকছে। ভাড়া বাসায়ই বাচ্চা প্রসব করছে। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই কেন!
* কাকেদের প্রতিশোধস্পৃহা তীব্র। এটা কেন?
** আমরা একতাবদ্ধ। প্রতিশোধপরায়ণ; তবে প্রতিহিংসাপরায়ণ নই। কেউ লাগতে এলে ছেড়ে কথা কই না। দীর্ঘ বছর পর হলেও শত্রুর মুখোমুখি হই। সব দোষ কি কাকেদের? মানুষ সুবোধ প্রাণী? আপনাদের বৃদ্ধ মানুষটিও ক্লাস ফাইভে কে তাকে অপদস্থ করেছিল তা মনে রেখে এখনো শোধ নেওয়ার চেষ্টা চালায়। বগুড়ার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটি তার শ্রেণিশিক্ষককে কী নির্মমভাবে পেটাল, দেখেননি?
* মুরুব্বিরা বলে কাক অশুভের প্রতীক। আদতে কি তাই?
** কাক অশুভের প্রতীক, শুভ প্রতীক কে তাহলে? মানুষ! তাহলে নিত্যদিনে দেশজুড়ে কে কার রক্ত ঝরায়। জেলখানা তৈরি হয়েছে কাদের জন্য। যাদের আপনারা অবিবেচনাপ্রসূতভাবে অশুভ বলেন, তাদের জন্য কি কোথাও কোনো জেলখানা আছে? ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করে! বুদ্ধিমান হলে জবাব খুঁজে পাবেন।
* প্রবাদ-প্রবচনে কিন্তু আপনারা এগিয়ে...
** জি। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না। হাস্যকর বিষয় হচ্ছে-কথাটা স্বজাতির ক্ষেত্রেই আপনারা ব্যবহার করেন। ভাত কি শুধু কাকেরা খায়? নাকি আপনারাও খান! বিবাদে শুধু শুধু কাকেদের ডাকা কেন! ছড়ায় আছে- দুধমাখা ভাত কাকে খায়। যেন কী না কী অপরাধের কাজ এটা। কাকেরা ছাইমাখা ভাত খেলে খুশি হবেন?
* আমাদের প্রবাদ সেকশন কিন্তু খুব সমৃদ্ধ!
** জি, আপনারা মহাজ্ঞানবান। চুল তো নয় যেন কাকের বাসা। ভূষণ্ডির কাক। কাকনিদ্রা। কাকচক্ষু। ঝড়োকাক। কাকভোর-এমন আরও প্রবাদ আছে! আপনি কাকস্য পরিবেদনার মতো সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন। এবার শান্তিতে মরতে দিন। আমরা আর এ শহরে থাকব না। ‘ও পাখি তোর যন্ত্রণা’ গানটা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে।
