রম্যগল্প
চাপাবাজ বন্ধু
Advertisement
হানিফ ওয়াহিদ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের স্কুল জীবনের বন্ধু ফাহিম যে পৃথিবীর সবকিছু জানে, এ বিষয়ে ওর নিজের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। তবে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ আমরা সবাই জানি, ফাহিম একটা আস্ত বোকা এবং চাপাবাজ। কিন্তু ফাহিমের আত্মবিশ্বাস হিমালয়ের চেয়েও বড়।
সেদিন বিকালে চায়ের দোকানে বসে আমরা কয়েকজন বন্ধু ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে কথা বলছিলাম। ?আমি বললাম, ‘দোস্ত, শচীন টেন্ডুলকার যদি ভারতের ক্রিকেটের বস হয়, সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের বস।’
ফাহিম চায়ে এক চুমুক দিয়ে চোখ পিটপিট করে বলল, ‘ঠিক, সাকিব আল হাসান ভালোই খেলত। কিন্তু তোরা কি জানিস সাকিবকে আসল কভার ড্রাইভটা কে শিখিয়েছিল?’
আমরা অবাক হয়ে বললাম, ‘কে?’
‘আমার বড় মামা।’
‘বলিস কী রে!’
‘ঘটনা শোন তাহলে। মামা যখন কেশবপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তখন তিনি একদিন ক্রিকেট খেলা দেখতে যান। পাশে সাকিব বসা ছিল। মামা তখন সাকিবকে হাতের কবজির মোচড়টা দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বল এভাবে মারবে। ব্যাস! পরের দিন থেকেই সাকিব হিট!’
আমি বিস্মিত গলায় বললাম, ‘এই কেশবপুরটা কোথায়?’
ফাহিম রাগী গলায় বলল, ‘কেশবপুর কই তাও জানিস না গাধা! ওটা মাগুরায়, সাকিব আল হাসানের এলাকা।’
আমরা কাপে চা খাওয়া ছেড়ে ফাহিমের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের আরেক বন্ধু তারেক ফিসফিস করে বলল, ‘তোর মামা না পাবনার এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক?’
ফাহিম সামান্যতম বিচলিত না হয়ে বলল, ‘আমার মামা ফুল টাইম শিক্ষক, পার্ট টাইম ম্যাজিস্ট্রেট। এগুলো গোপন বিষয়, সবাইকে বলে বেড়াব নাকি! আচ্ছা শোন, তোদেরকে আরেকটা বিষয় শেখাই, এই যে শীতের দিনে কুয়াশা পড়ে ওটা কী জানিস?’
বন্ধু রানা বলল, ‘জানি না।’
‘জানবি কী করে? পড়াশোনায় মন থাকলে তো জানবি। এই কুয়াশা হচ্ছে রোদের গুঁড়া। রোদ গুঁড়া গুঁড়া হয়ে কুয়াশা তৈরি করে। এখান থেকেই শিশির তৈরি হয়।’
রানা অবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘তুই কীভাবে জানিস? এটা কোন বইয়ে লেখা আছে?’
ফাহিম চোখ গরম করে বলল, ‘তুই কি ভাবছিস আমি মিথ্যা বলছি? বিশ্বাস না হলে আমার শিক্ষক মামাকে জিজ্ঞেস করে আয়। মামাই তো আমাকে শিখিয়েছে। মামা একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক।’
রানা আবারও অবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘প্রাইমারি স্কুলে আবার বিজ্ঞান শিক্ষকও থাকে?’
ফাহিম সেই জবাব না দিয়ে উঠে গেল।
ফাহিমের জ্ঞান শুধু ক্রিকেট আর বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়, সাহিত্যেও তার অগাধ জ্ঞান।
সেদিন এলাকার রানা ভাই হুমায়ূন আহমেদের একটা বই কিনে এনেছে। বইয়ের নাম ‘এবং হিমু’। ফাহিম এই বই নেড়েচেড়ে বলল, ‘হিমু চরিত্রটা হুমায়ূন আহমেদ কোথা থেকে পেয়েছে জানেন?’
রানা ভাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘আমার এক খালাতো ভাইয়ের চরিত্র থেকে। একবার হুমায়ূন আহমেদ নোয়াখালী গিয়েছিলেন, ওখানেই আমার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। খালাতো ভাইকে দেখেই তিনি হিমুর চরিত্র নকল করেছেন।’
আমি বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম, ‘আমি তো জানি তোর কোনো খালা নাই, দুই মামা আছে। আর তোর নানাবাড়ি না পিরোজপুর?’
ফাহিম রাগী গলায় বলল, ‘সবসময় গাধার মতো কথা বলিস না তো। খালা নাই তো কী হয়েছে? ফুফু আছে না?’
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, ‘তা অবশ্য আছে।’
আরেকদিন সাহিত্যের আলাপ উঠতেই ফাহিম বলল, ‘একটা কথা বলি শোন, তোরা তো জানিস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামের লেখা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে।’
আমাদের বন্ধু রানা বলল, ‘তোর মুখে শুনেছি।’
‘ভুল শুনেছিস। আমি ভুল বলেছি। আসল সত্যি কথাটা আজকে শুনবি? আমি আসলে লজ্জায় কথাটা কাউকে বলি নাই। এতবড় কবি, তার চুরির কথা কীভাবে বলি, বল? আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার মামার কবিতা নকল করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।’
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, ‘তোর মামার নাম কী?’
‘এম ডি মুরাদ।’
আমি বললাম, ‘এম ডি মুরাদের একটা বই আমাদের বাসায় আছে। ওই লোক তো আউল ফাউল প্রেমের উপন্যাস লেখে।’
ফাহিম বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুই এত গাধা কেন বল তো? যে লেখক প্রেমের উপন্যাস লিখতে পারে, সে কি কবিতা লিখতে পারবে না?’
আমি মিনমিনে গলায় বললাম, ‘অবশ্যই পারবে, অবশ্যই।’
