মলাট বৃত্তান্ত
চাকরিজীবী বেকার
কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস বিভাগই নেই। অথচ ১৬ জন শিক্ষক কর্মরত আছে-এর মানে কী? * সাবজেক্ট নেই, ১৬ জন শিক্ষক তো আছে! এটাই সায়েন্স, এটাই আর্টস!
Advertisement
সত্যজিৎ বিশ্বাস
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাকিব হেলাফেলা করার মতো কেউ নন। ক্যাপিট্যাল সিটির নামিদামি সরকারি এক কলেজের শিক্ষক। হোক না সেটা বড় নেতা ধরে, টাকা-পয়সা দিয়ে। ধরাধরিও একটা বড় যোগ্যতা। সেই যোগ্যতা সবার থাকে না।
কিন্তু তাতেও কী লাভ হলো? ছোটবেলায় রাকিবের মা একটা কথা বলতেন। যত বুদ্ধি কর তুমি আগে আর পিছে, কোনো বুদ্ধি খাটবে না ঘর পোড়ার কাছে। রাকিব হচ্ছে সেই ঘর পোড়া। নইলে কলেজের সামনের টং দোকানিও তাকে চেনে অন্য পরিচয়ে! আর সবার মতোই টং দোকানি জানে, রাকিবুর জামান, কলেজে ঘোরেন-ফেরেন, টাকা কামান।
এটা কোনো কথা? রেগেমেগে রাকিব ঠিক করলেন, আগামী একমাস আর কলেজেই আসবেন না। কম খরচে একমাস বউকে নিয়ে কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়, ভাবতে বসলেন। চিকন বুদ্ধির রাকিবের বেশিক্ষণ অবশ্য ভাবতে হলো না। ভেবে যে জায়গাটার নাম বের করলেন, সেখানে গেলে শুধু কম খরচ না, একেবারে বিনা খরচেই বউকে নিয়ে জামাই আদরে থাকা যায়। আর দেরি না করে ছুটলেন সেখানেই। কিন্তু কথায় আছে না, অভাগা যেদিকে যায় সেদিকে সাগরও শুকিয়ে যায়।
শ্বশুরবাড়ি কতটা মধুর হাড়ি-পরখ করতে এসে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হবে জানলে শ্বশুড়বাড়িতেই আসতেন না। সপ্তাহখানেক ভালোই ছিলেন। তারপরই ফিসুরফাসুর কথা ভেসে আসতে লাগল চারপাশ থেকে। এক দুপুরে খেতে বসে যেই কাতল মাছের মাথাটা হাঁ করে মুখে তুলতে গেছেন, ওমনি শালা বলে উঠল, ‘দুলাভাই ঘটনা কী? সারা দেশের সব কলেজই তো খোলা? আপনার কলেজ বন্ধ নাকি?’ শুনে পাশের চেয়ারে বসা শ্বশুর মুচকি হাসি দিলেন।
একটা সময় ছিল শিক্ষকের মর্যাদা দিতেন স্বয়ং বাদশাহ্ আলমগীর। আর এখন? শিক্ষকের প্রতি পুত্রের অপমানসূচক কথা শুনে বাপ হাসে। তাও আবার তার শ্বশুরবাপ! এ কেমন বাপ?
রাকিব মুখ গোমড়া করে বললেন, ‘কলেজ বন্ধ না, ছুটি নিয়ে এসেছি।’
ত্যাঁদড় শালা পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘কতদিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন?’
রাকিব হাত থেকে কাতল মাছের মাথাটা নামিয়ে রাখলেন। তার ইচ্ছা করছে, শালার মাথাটা চিবিয়ে খেতে। সহজ প্রশ্নের উত্তর সব সময় সহজ হয় না। কী করে বলবেন, ঢাকাতে যে কলেজে চাকরিতে ঢুকেছেন, সেখানে তার ডিপার্টমেন্টই নেই! ক্লাস নেবেন কোথায়? কলেজে গিয়ে আড্ডা মেরেই সময় কাটাতে হয়। তাই তো শুয়ে, বসে মাস কাটানোর ইচ্ছা নিয়েই শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন। এমন কী, শ্বশুরবাড়ি থেকে অনুরোধ আসলে কাটিয়ে দিতে পারেন আগামী কয়েক মাস। শুধু মাসের শুরুতে একদিনের জন্য ঢাকা গিয়ে বেতনটা তুলে নিয়ে আসলেই হলো। ব্যস, কলেজের কাজ শেষ।
‘দুলাভাই, কী এত ভাবছেন?’ এবার পাশ থেকে তেড়ে এলো কলেজ পড়ুয়া শালী।
‘ভাবছি, তোমার বোনের অনুরোধে চলে যে এলাম, কলেজের ছেলেমেয়েগুলো কী পড়ালেখা করছে কে জানে?’
‘আপনি কোন্ সাবজেক্ট পড়ান?’
‘ইতিহাস। আসলে হয়েছে কী, কলেজে ইতিহাসের আর শিক্ষক নেই, এমন না। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো বলে, আমি পড়ালে সেই পড়া আর বাসায় গিয়ে পড়তে হয় না।’ রাকিব একের পর এক নতুন ইতিহাস রচনা করে যায়।
‘ইশ! এদিকে আমাদের লোকাল কলেজে একজন শিক্ষকও নেই ইতিহাসের। ইংরেজি স্যার মাঝে মাঝে ইতিহাস ক্লাসে এসে এটা পড়, সেটা পড় বলে চলে যান। আপনার মতো একজন শিক্ষক যদি আমাদের কলেজে থাকত।’
কোনো কথা না বলে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিলেন রাকিব। শালা, শালী একটার চেয়ে আরেকটা বেশি ত্যাঁদড়। কোন কথা বলে আবার কীসে ফেঁসে যেতে হয়, ঠিক নেই।
বিকালে নদীর পাড়ে হাঁটতে বের হলেন রাকিব। নদী দেখতে দেখতে সাকিবকে ফোন দিলেন। সাকিব তার কলেজেরই পলিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক। একই সঙ্গে কলেজে আড্ডা দিতে দিতে দুইজন বন্ধু হয়ে গেছেন।
‘হ্যালো সাকিব, কী অবস্থা?’
‘আর অবস্থা! আপনি তো শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেন, এদিকে আড্ডা মারার কেউ নেই। ভীষণ বোরিং সময় পার করছি। কবে আসবেন?’
‘এসে করবটা কী? টাকাপয়সা দিয়ে ঢাকায় ট্রান্সফার হলাম, কলেজে পড়াব। টিউশনি করব। নাম ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। কীসের কী? ইতিহাসের টিচার হিসাবে কলেজে ঢুকে ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেললাম। ইতিহাস ডিপার্টমেন্টই নেই!’ রাকিব ক্ষোভ ঝাড়ে।
‘আমিও যে কোনো অভিশাপে পলিটিক্যাল সায়েন্সের টিচার হয়ে এই কলেজে ঢুকলাম? আরে বাবা, তোদের যদি পলিটিক্যাল সায়েন্স সাবজেক্টই না থাকে, তাহলে আমাকে নিলি কেন?’ সাকিবও রাগে ফেটে পড়ে ফোনে।
‘পড়াতেই যদি না পারি, তাহলে শিক্ষক হয়ে কী লাভ হলো? আজ কী শুনলাম জানেন? এখানে লোকাল কলেজে নাকি একজনও ইতিহাস শিক্ষক নেই। হায় রে কপাল!’
ফোনে কথা শেষ করে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকে রাকিব। এ দেশে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় সবাই গ্রাম থেকে রাজধানীতে ছোটে। রাজধানী থেকে গ্রামে কেউ ছোটে না। তাই ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৭শ অতিরিক্ত শিক্ষক। অথচ গ্রামে শিক্ষকের জন্য হাহাকার। ক্লাস নেই তাই ঢাকার এই অতিরিক্ত শিক্ষকদের দিন কাটে আড্ডায়। নিজের ভবিষ্যতের সুব্যবস্থা করা হলো বাস্তবতা, আবেগ হলো ঘোর। নদীর বাতাসে একটা ঘোর লাগানো ব্যাপার থাকে। সেই ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে রাকিব কী সিদ্ধান্ত নেবে কে জানে!
