হালিমার ঘরে রহমতের আলো হয়ে এসেছিলেন শিশু মুহাম্মাদ (সা.)
Advertisement
ইমাম সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন-
‘হে রাসূল! আমি তো আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য শুধু রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া-২১ : আয়াত-১০৭)।
হজরত রাসূল (সা.) হলেন কুলকায়েনাত তথা সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত। তাই তো আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত রাসূল (সা.)-এর শুভ জন্মের দিন মক্কা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসহ সারা বিশ্বে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়। শুধু তাই নয়, রহমতের এ রাসূল যখন শৈশবে দুধমাতা হালিমা (রা.)-এর ঘরে তশরিফ রাখেন, তখনো বিবি হালিমা (রা.)-এর ছোট্ট কুটিরসহ সমগ্র তায়েফে আল্লাহতায়ালার অবারিত রহমত-বরকতের জোয়ার বইতে শুরু করে। শিশু হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমনে বিবি হালিমা (রা.)-এর সংসারে এমনই অভাবনীয় বরকত সাধিত হয় যে, তার ঘরটি যেন তায়েফের বুকে এক টুকরো বেহেশতে পরিণত হয়। এ কারণেই বিবি হালিমা (রা.)-এর প্রতিবেশীরা প্রায়শই অবাক হয়ে তাকে বলত-
‘হালিমা! তুমি এ কোন বরকতময় শিশুকে ঘরে নিয়ে এলে যে, তোমার ঘরে রহমতের বন্যা বইতে শুরু করল?!’
শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.) দীর্ঘ ৬ বছর তায়েফের মরুপ্রান্তরে মহীয়সী ও পুণ্যবতী নারী হজরত হালিমা (রা.)-এর গৃহে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। এসময় রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বরকতে বিবি হালিমা (রা.)-এর জীবনে অগণিত অলৌকিক মুজিজা সংঘটিত হয়। তন্মধ্যে একটি মর্মস্পর্শী মুজিজা পাঠকদের সম্মুখে তুলে ধরছি-
একদা হজরত হালিমা (রা.) হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগল। তার অবস্থার এতটাই অবনতি ঘটল যে, একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। হজরত হালিমা (রা.)-এর এরূপ মুমূর্ষু অবস্থা দেখে তার স্বামী হারিস ও পরিবারের লোকেরা অত্যন্ত চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারা হজরত হালিমা (রা.)-এর চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ কবিরাজ-বৈদ্যদের ডেকে আনলেন। কবিরাজ-বৈদ্যরা তাদের সাধ্যমতো হজরত হালিমা (রা.)কে সুস্থ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করল। তারা মরুভূমির নানাপ্রকার ঔষধি গুল্ম ও লতাপাতা দিয়ে চিকিৎসা করল, কিন্তু এতে কোনো ফল হলো না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হজরত হালিমা (রা.)-এর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে লাগল। এ অবস্থা দেখে পরিবারের সবাই অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তারা হজরত হালিমা (রা.)-এর চিকিৎসার জন্য তান্ত্রিক-ওঝাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে এলেন। জ্ঞানহীন অবস্থায় হজরত হালিমা (রা.)-এর নিথর দেহ বিছানায় পড়ে রয়েছে, ঘর ভর্তি লোকজন, সবার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। ওঝা-তান্ত্রিকরা তার চারপাশ ঘিরে রয়েছে।
প্রধান তান্ত্রিক হজরত হালিমা (রা.)-এর চারপাশে বিভিন্ন ছোট ছোট দেব-দেবীর মূর্তি ও তাবিজ-কবজ রাখলেন। অন্যান্য তান্ত্রিকরা কেউ ঘণ্টার ধ্বনি দিচ্ছে, কেউ ধূপ জ্বালিয়ে মন্ত্র পাঠ করছে, কেউবা দেবতাদের গুণকীর্তন করছে। এভাবে দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরও হজরত হালিমা (রা.)-এর জ্ঞান ফিরল না। তখন ওঝা-তান্ত্রিকরা আশা ছেড়ে দিল। তারা ব্যর্থ মনোরথে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তান্ত্রিক-ওঝাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখে পরিবারের সবার মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। তাদের আর্তচিৎকারে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। তারা বুঝে গেল যে, হজরত হালিমা (রা.)কে আর কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব নয়। ঠিক সে মুহূর্তে শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.) গৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি অচেতন হজরত হালিমা (রা.)-এর শিয়রে গিয়ে বসলেন। এরপর তিনি হজরত হালিমা (রা.)-এর চারপাশে রাখা দেব-দেবীর মূর্তি ও তাবিজ-কবজগুলো সরিয়ে দিলেন এবং স্বীয় হাত মোবারক অচেতন হজরত হালিমা (রা.)-এর কপালে রাখলেন। আল্লাহর কী অপার মহিমা! শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বরকতময় হাত মুবারকের স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যেই হজরত হালিমা (রা.)-এর জ্ঞান ফিরে এলো। হজরত হালিমা (রা.) ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন এবং দেখতে পেলেন তার কপালে হাত মুবারক রেখে শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.) শিয়রে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র হাত মুবারকের স্পর্শেই তিনি নবজীবন লাভ করেছেন। তিনি শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর দিকে তাকিয়ে আনন্দে দুচোখের পানি ফেলে তাকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এদিকে শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বরকতে মৃত্যু পথযাত্রী হজরত হালিমা (রা.)কে সুস্থ হতে দেখে উপস্থিত তান্ত্রিক-ওঝারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল এবং তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে হজরত হালিমা (রা.) নবজীবন লাভ করায় তার পরিবারে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করল। এ ঘটনার পর থেকে হজরত হালিমা (রা.)-এর পরিবারের সবাই শিশু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)কে ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা করাও শুরু করল।
পরিশেষে, মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে আকুল ফরিয়াদ জানাই, আমরা যেন তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত এ রহমতের রাসূল (সা.)কে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে নিজেদের জীবনকে রহমতে পরিপূর্ণ করতে পারি। আমিন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
