ইলমের বাতিঘর আত্মশুদ্ধির পথপ্রদর্শক
আল্লামা মুফতি আবু সাঈদ
Advertisement
মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সমাজে মানুষের ভিড় আছে, কিন্তু প্রকৃত মানুষের বড় অভাব। সততা, মানবিকতা, বিবেক, নৈতিকতা ও আদর্শের সমন্বয়ে যারা নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন, তাদের সংখ্যা খুবই কম। ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের ‘নিষ্প্রদীপ’ কবিতার পঙ্ক্তি-‘মানুষ খুঁজিয়া ফিরি জনতায়, মানুষ কই’-যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বিরল কিছু মানুষ তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নির্মল চরিত্র, ত্যাগ ও কর্মের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি আবু সাঈদ তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ইলম, আমল ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত সাধনায় বহু মানুষের পথপ্রদর্শক।
১৯৬২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮ রমজান ১৩৮১ হিজরি শুক্রবার সুবহে সাদেকের সময় চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানাধীন ফুলছোঁয়া গ্রামে তার জন্ম। পিতা মৌলভী আবদুল লতিফ (রহ.) ছিলেন একজন বুজুর্গ ও শিক্ষক। বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব হজরত কারি ইবরাহীম (রহ.) ছিলেন তার পিতার পীর ও মুর্শিদ।
গ্রামের মক্তব ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর তিনি উজানীর ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। সেখানে কাফিয়া পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদে ভর্তি হন। দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় দাওরায়ে হাদিসে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
১৯৮৪-৮৫ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে পুনরায় দাওরায়ে হাদিসে অধ্যয়ন করেন। সেখানে হজরত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)-এর কাছে সহিহ বুখারি ও সুনানে তিরমিজির প্রথম ভাগ পড়েন। দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায়ও প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে রমজান মাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মুফতি হজরত হাবিবুর রহমান খায়রাবাদী (রহ.)-এর কাছে ফতোয়া ও ফারায়েজ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে খায়রাবাদী (রহ.) তাকে বিশেষ সনদ ও ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দেন।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই ফরিদাবাদ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে উচ্চস্তরের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার শুরুতেই তিনি মাদ্রাসাটির প্রধান মুফতির দায়িত্ব পান। নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার মাধ্যমে হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও মানতিকসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে দেশের ফিকহ ও ফতোয়াবিষয়ক অঙ্গনে বিশিষ্ট আলেম হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। জটিল বিষয় সহজভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা তাকে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
আধ্যাত্মিক সাধনায়ও তার রয়েছে দীর্ঘ পথচলা। মাওলানা মসিহুল্লাহ খান (রহ.), শায়খুল হাদিস মাওলানা ইউনুস (রহ.) এবং চট্টগ্রামের প্রখ্যাত বুজুর্গ মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভ করেন। নানুপুরী (রহ.)-এর খলিফা হিসাবে তিনি বহু মানুষের আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। তার মুরিদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আলেম রয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি সুন্নতে নববীর অনুসরণ, বিনয়, নির্লোভতা ও উত্তম চরিত্রের জন্য পরিচিত। ছোট-বড় সবাইকে আগে সালাম দেওয়া, কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা তার জীবনাচরণের উল্লেখযোগ্য দিক।
তার অন্যতম বড় অবদান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা। পীর ও মুর্শিদ মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)-এর নির্দেশে পিতার দান করা ৩০ শতাংশ জমিতে ১৯৯৫ সালের ২২ মার্চ ফুলছোঁয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া কুরআনিয়া ইমদাদুল উলূম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। ফিকহ ও ফতোয়া এবং আরবি আদব ও ভাষাশিক্ষাসহ বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার মান, অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাকের চর্চায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের উল্লেখযোগ্য দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার শ্যামপুরের রসুলবাগে প্রতিষ্ঠা করেছেন দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদ। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্ধশতাধিক মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়।
দরস-তাদরিস, ওয়াজ-নসিহত ও ইরশাদের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের শুদ্ধ আকিদা, নৈতিকতা ও সুন্নতভিত্তিক জীবন গঠনে উৎসাহিত করেন। প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকলেও ইসলাম, দেশ ও জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তার মতে, মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে শরিয়তের অনুশীলন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসলামি শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
প্রতি বছর তার তত্ত্বাবধানে ফুলছোঁয়া মাদ্রাসায় দুই দিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ইমান-আকিদা, কুফর-শিরক, বিদআত-কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা এবং অজু, গোসল, নামাজসহ দৈনন্দিন জীবনে সুন্নত অনুসরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইখলাস, তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের শিক্ষা গুরুত্ব পায়। শরিয়ত ও আত্মশুদ্ধির সমন্বিত চর্চার কারণে মাহফিলটি সাধারণ মানুষের দ্বীনি শিক্ষার বিশেষ পরিসর হয়ে উঠেছে।
দ্বীনি শিক্ষাদান ও লেখালেখিতেও তার অবদান রয়েছে। মাসিক মদিনাসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে তার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমকালীন জরুরি মাসায়িল’, ‘আধুনিক সমস্যার সমাধান’, ‘মৌলিক আকিদা’, ‘পাঁচ ওয়াক্তের হাদিয়া’, ‘মহিলারা কোথায় নামাজ আদায় করবেন’ এবং ‘ইসলামের দৃষ্টিতে রোগী, ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’। তার বয়ানের সংকলন ‘দীনি মাওয়ায়েজ’ নামেও প্রকাশিত হয়েছে।
জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক জীবন গড়ার প্রচেষ্টায় আল্লামা মুফতি আবু সাঈদ সমকালীন দ্বীনি অঙ্গনে একটি পরিচিত নাম। মহান আল্লাহ তার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ নেক হায়াত ও দ্বীনি খেদমত কবুল করুন। আমিন।
লেখক : মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, জামিয়াতুল উলূম আল-ইসলামিয়া
