মাদ্রাসা হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল
Advertisement
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়; এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আদর্শ চরিত্র গঠনের ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে দ্বীনি শিক্ষার যে ধারার সূচনা করেছিলেন, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আসহাবে সুফফা। মসজিদে নববীর পেছনের অংশে অবস্থিত এ শিক্ষাকেন্দ্রে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন। সেই ঐতিহাসিক শিক্ষাধারার ধারাবাহিকতায় যুগে যুগে মাদ্রাসা দ্বীনি জ্ঞানের বিস্তার, কুরআন-হাদিসের শিক্ষা সংরক্ষণ এবং আদর্শ মানুষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কুরআন হিফজ, নাজেরা ও কুরআন হাদিসের ইলম শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাধারণ জ্ঞান শিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে হিফজ একটি দীর্ঘমেয়াদি সাধনা, যার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, শৃঙ্খলা ও নিবিড় তত্ত্বাবধান। অনেক অভিভাবকের পক্ষে পারিবারিক পরিবেশে সন্তানের পড়াশোনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। আবার সবার আর্থিক ও পারিবারিক সামর্থ্যও সমান নয় যে, তারা প্রাইভেট শিক্ষক রেখে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন। ফলে সন্তানের দ্বীনি শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অনেক অভিভাবক আবাসিক মাদ্রাসার ওপর নির্ভর করেন।
এভাবে একজন শিশু দীর্ঘসময় পরিবার থেকে দূরে মাদ্রাসার আবাসিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। পরিবার থেকে দূরে থাকা এসব শিশুর নিরাপত্তা ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আবাসিক মাদ্রাসার দায়িত্ব শুধু পাঠদান ও কুরআন হিফজ করানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা এবং সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অভিভাবকরা যে বিশ্বাস নিয়ে তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকের নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন সময়ে দেশের কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এমনকি যৌন নিপীড়নের অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু কোমলমতি শিশুদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে না; বরং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকসমাজ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিশেষ করে যে শিশুরা দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা অর্জনের আশায় অভিভাবকের স্নেহ-মমতা ছেড়ে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে আসে, তাদের জন্য এমন অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা সব আলেম-ওলামা ও শিক্ষককে দায়ী করা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়।
দেশের অসংখ্য মাদ্রাসায় হাজারো শিক্ষক নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। তাদের শ্রম ও অবদান সমাজে সম্মানের দাবিদার। কিন্তু এই সম্মান ও আস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে অপরাধীদের আড়াল না করে বরং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ একজন অপরাধীর দায় কোনোভাবেই হাজারো সৎ ও দায়িত্বশীল শিক্ষকের ওপর চাপানো যায় না। এখানে মনে রাখতে হবে, শিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, পেশা কিংবা প্রতিষ্ঠানের একক সমস্যা নয়।
মাদ্রাসা, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধ ঘটতে পারে। তাই অপরাধকে অপরাধ হিসাবেই দেখতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব যেন অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। একইসঙ্গে মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, মাদ্রাসায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
শিশুদের শাসনের নামে বেত্রাঘাত, মারধর, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা মানসিকভাবে হেয় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধনে ধৈর্য, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সুন্দর আচরণই হওয়া উচিত শিক্ষকের প্রধান হাতিয়ার। শাসন কখনো নির্যাতনের পর্যায়ে যেতে পারে না। একজন শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা নয়, বরং ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী যেন ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের সমস্যার কথা জানাতে পারে, সেজন্য অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অভিযোগ পাওয়ার পর তা অবহেলা না করে গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শিশুদের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সততা ও দায়িত্বশীলতার ওপর।
তাই শিক্ষক ও আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাদের পরিচয়, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, অভিজ্ঞতা ও প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি শিশু মনোবিজ্ঞান, শিশু অধিকার, নিরাপদ আচরণ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে সরকারি নিবন্ধিত শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত, আবাসিক পরিবেশ হতে হবে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও বয়সোপযোগী। শিক্ষার্থীদের ঘুম, গোসল, পোশাক পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের শয়নকক্ষ, শৌচাগার, সিঁড়ি ও সাধারণ চলাচলের স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, শিশুদের বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। কেউ অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করলে কীভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, কাকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে-এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের শেখানো জরুরি। একইসঙ্গে অভিভাবকদেরও সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও অস্বাভাবিক ভীতির লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কারণ শিশুর আচরণ ও মানসিক পরিবর্তনের প্রতি যথাযথ মনোযোগ অনেক সময় সম্ভাব্য বিপদের আগাম সংকেত দিতে পারে।
ষষ্ঠত, মাদ্রাসা পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আবাসিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কমিটির প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সরকারি নিবন্ধিত প্রতিটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব সফটওয়্যার বা তথ্যভান্ডার থাকতে পারে, যেখানে প্রমাণসহ নথিভুক্ত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথির তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। তবে অভিযোগ, তদন্তাধীন বিষয় এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ-এ তিনটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে আলাদা রাখতে হবে। আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে কোনো প্রমাণিত অপরাধী এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আবার শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি অধিকারও সংরক্ষণ করতে হবে।
সপ্তমত, কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নির্যাতন বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলে তা সামাজিক সম্মান, প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা আপস-মীমাংসার অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। প্রথমেই শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা, শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা বা গালাগাল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকারী শিশুকে অবিশ্বাস করে বিষয়টি উপেক্ষা করাও অন্যায়। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শিশুদের সহায়তার জন্য সরকারের শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ সম্পর্কেও শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানাতে হবে। শিশু নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ নম্বরে বিনামূল্যে সহায়তা চাওয়া যায়। প্রতিটি মাদ্রাসায় এ ধরনের জরুরি সহায়তার তথ্য দৃশ্যমান স্থানে রাখা যেতে পারে। এতে কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে কিংবা নির্যাতনের শিকার হলে সহায়তা পাওয়ার পথ সম্পর্কে জানতে পারবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিশুদের প্রতি ইসলামের মানবিক শিক্ষাও যথাযথভাবে ধারণ করতে হবে। ইসলাম শিশুদের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও কোমল আচরণের শিক্ষা দিয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এ শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কিংবা নির্যাতন কখনো আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় হতে পারে না। একজন প্রকৃত শিক্ষকের পরিচয় তার জ্ঞান, চরিত্র, দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি সুন্দর আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। একইভাবে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের নয়; অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠানোর পর তার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সন্তানের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতাই শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ
