বীজ থেকে বৃক্ষ
সৃষ্টির বিস্ময়কর যাত্রা
মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিশাল বৃক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। মাটির নিচে অন্ধকারে পড়ে থাকা সেই বীজ উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হয়, শিকড় ছড়ায়, মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসে কচি চারা। সময়ের পরিক্রমায় সেই চারাই পরিণত হয় বিশাল বৃক্ষে। জন্ম দেয় ফুল, ফল ও নতুন বীজের। প্রকৃতির এ বিস্ময়কর যাত্রা মহান আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরত ও সৃষ্টিকৌশলের অনন্য নিদর্শন।
পবিত্র কুরআন মানুষকে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ শস্যদানা ও ফলের আঁটি বিদীর্ণকারী।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত : ৯৫)। ক্ষুদ্র বীজ থেকে নতুন জীবনের বিকাশে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।
বীজের ভেতরে থাকে নতুন উদ্ভিদের ভ্রূণ, খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যবস্থা ও সুরক্ষামূলক আবরণ। পর্যাপ্ত পানি, অক্সিজেন ও উপযুক্ত তাপমাত্রা পেলে বীজের ভেতরের জৈবিক কার্যক্রম সক্রিয় হয়। প্রথমে শিকড় বের হয়ে মাটির গভীরে প্রবেশ করে। এরপর কাণ্ডের অঙ্কুর মাটি ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে যায়।
মাটি গাছকে দাঁড়িয়ে থাকার অবলম্বন দেওয়ার পাশাপাশি পানি ও খনিজ পুষ্টি সরবরাহ করে। মাটির আর্দ্রতা, গঠন ও পুষ্টির ভারসাম্য চারার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো মৃত জমিন; আমি তাকে জীবিত করি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করি।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত : ৩৩)।
পানি বীজের অঙ্কুরোদ্গমের অন্যতম প্রধান শর্ত। এটি বীজের ভেতরের জৈবিক কার্যক্রম সচল করে এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে পুষ্টি পরিবহণে সহায়তা করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)।
অন্যদিকে, সূর্যলোক উদ্ভিদের খাদ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাতার ক্লোরোফিল সূর্যলোকের শক্তি ব্যবহার করে পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে। এ খাদ্য উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশে শক্তি জোগায়।
বৃক্ষের প্রতিটি অংশের রয়েছে স্বতন্ত্র দায়িত্ব। শিকড় মাটি থেকে পানি ও খনিজ উপাদান শোষণ করে, কাণ্ড পানি ও পুষ্টি পরিবহণে সহায়তা করে এবং পাতা খাদ্য তৈরি করে। এসব অংশের সমন্বিত কার্যক্রমে ছোট চারা একসময় বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়। পরিণত বৃক্ষে ফুল ও ফল জন্মে। ফুলের পরাগায়ন ও নিষেকের মাধ্যমে নতুন বীজ তৈরি হয়। এভাবে প্রকৃতিতে উদ্ভিদের বংশধারা অব্যাহত থাকে।
বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন নির্গত করে, মাটির ক্ষয় রোধে সহায়তা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম যখন গাছ লাগায় অথবা শস্য বপন করে, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি কিংবা পশু খায়, তখন তা তার জন্য সদকা হিসাবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৫৩)।
ইসলাম বৃক্ষরোপণ ও প্রকৃতির পরিচর্যায় উৎসাহিত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারও হাতে যদি একটি চারা থাকে এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে সেটি রোপণ করার সুযোগ পায়, তবে সে যেন তা রোপণ করে।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ১২৯০২)।
বীজ থেকে বৃক্ষ হয়ে ওঠার যাত্রা আমাদের ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও পরিচর্যার শিক্ষা দেয়। একটি বীজ যেমন রাতারাতি বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয় না, তেমনি মানুষের জ্ঞান, চরিত্র ও সাফল্য অর্জনেও প্রয়োজন নিয়মিত চেষ্টা ও ধৈর্য।
ক্ষুদ্র বীজ থেকে বিশাল বৃক্ষের জন্ম মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। তাই তার নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ, গাছের পরিচর্যা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের সচেতন ভূমিকা রাখা উচিত। একটি ছোট বীজ যেমন একদিন বহু মানুষের উপকারে আসে, তেমনি আমাদের ছোট একটি ভালো কাজও ভবিষ্যতে অনেক কল্যাণের কারণ হতে পারে।
লেখক : প্রভাষক (আরবি), মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম।
