Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বাঙালি সংস্কৃতিতে সুফি সাহিত্যের প্রভাব

Icon

মুহাম্মদ জহিরুল আলম

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সব সৃষ্টির মাঝে একমাত্র মানুষেরই সংস্কৃতি রয়েছে। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর সংস্কৃতি নেই, কারণ সংস্কৃতি একটি মানবীয় ব্যাপার। মানবশিশু জন্মের পর থেকেই চিন্তায়, কথা, কর্মে ও আচরণে যে পদ্ধতিতে সুন্দর ও মানবীয় হয়ে ওঠে তাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো নিজেকে সুন্দর করে বিকাশের কৌশল। তাই পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র সংস্কৃতিবান প্রাণী।

আমরা বাঙালি, আমরা অনন্য সংস্কৃতির অধিকারী। হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে ‘বঙ্গীয় সংস্কৃতি’। ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ ভিত্তি ‘বঙ্গীয় সংস্কৃতি’। মূলত ১৩৫০-এর দশকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে বৃহত্তর ‘বাঙ্গালা’ অঞ্চলের জন্ম দেন, তখন থেকেই বাংলা ভাষা নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। আমাদের ভাষা, সাহিত্য; ধর্ম ও বিশ্বাস; শিক্ষা, অভ্যাস, রীতিনীতি, সংগীত, সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়মকানুন; উৎসব ও পার্বণ; স্থাপত্য ও শিল্প কর্ম এবং প্রযুক্তি নিয়েই বাঙালি সংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতিতে যেসব উপাদান রয়েছে তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলা ভাষা।

বাংলায় মুসলিম শাসন বাংলা ভাষাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সেসময় ওলি-আল্লাহ্রা বঙ্গভূমিতে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন এবং স্থানীয় লোকজন ভক্তিভরে গ্রহণ করেন। সুলতানরা বাংলা ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তখন হাজার হাজার আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ে। পনেরো শতক থেকেই সুফি সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে থাকে। শতেরো-আঠারো শতকে কিছু পর্তুগিজ শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান নেয়, পরবর্তী সময় ব্রিটিশরা শাসনভার গ্রহণ করলে হাজারো ইংরেজি শব্দ আমাদের মুখে উচ্চারিত হয়।

মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা যা সুফি তত্ত্বকে আশ্রয় করে উদ্ভূত ও বিকশিত হয়েছিল তা হলো সুফি সাহিত্য। এর ফলে একদিকে যেমন মানুষ আল্লাহর পথে নিজেকে ধাবিত করেছে, অন্যদিকে রাসূল প্রেমের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অলি-আল্লাহরা বাংলায় আগমন করেন এবং মুসলমানদের বঙ্গ বিজয়ের পর তা আরও পৃষ্ঠপোষকতা পায়। মহামানবরা ঢাকা, বগুড়া, পাবনা, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে খানকাহ, মসজিদ, মক্তব ইত্যাদি স্থাপনের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। সুফিদের উদারনীতি ও মানবপ্রেম এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে আকৃষ্ট হয়ে সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তেরো শতকের শেষদিকে সোনারগাঁ এবং চৌদ্দ শতকে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং ত্রিবেনী মুসলমান সমাজ ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাদের মানসিক চাহিদা নিবৃত্তি ও সুফি দর্শনকে প্রাধান্য দিয়ে সুফি ভাবধারার কবিরা বাংলা ভাষায় যে সাহিত্য নির্মাণ করেন তাই সুফি সাহিত্য নামে বিকশিত হয়।

বাংলা ভাষায় সুফিতত্ত্ব বিষয়ে দুধরনের কাব্য রচিত হয়েছে শাস্ত্রকাব্য ও পদাবলী। শাস্ত্রকাব্যে সুফি সাধনা, সৃষ্টিতত্ত্ব, যোগতত্ত্ব, নীতি-উপদেশ, জীবাত্মা ও পরমাত্মা ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পায়। শেখ জাহিদের আদ্য পরিচয়; সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানপ্রদীপ ও জ্ঞানচৌতিশা, যোগকলন্দর; আবদুল হাকিমের চারি-মাকাম-ভেদ; হাজী মহম্মদের সুরতনামা; মীর মুহম্মদ সফীর নুরনামা; শেখ মনসুরের সির্নামা; আলী রজার আগম ও জ্ঞানসাগর অন্যতম। পদাবলীতে সুফিতত্ত্বের আধ্যাত্মিক ভাবের প্রকাশ ঘটে। আল্লাহর প্রেম ও সৌন্দর্য, চিত্তশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ, আধ্যাত্মিক সাধনা এখানে প্রকাশ পায়। পদকর্তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আইনুদ্দীন, আফজল, আলাওল, আলী রজা, নাসির মাহমুদ, মীর ফয়জুল্লাহ্, শেখ কবির, শেখ চাঁদ, সৈয়দ মর্তুজা, সৈয়দ সুলতান। এখানে সুফি ধর্ম সাধন ও তত্ত্বচিন্তা কাব্যসৌন্দর্যে ফুটে উঠেছে।

সুফি সাহিত্য আমাদের বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরবর্তিতে তা আমাদের সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলে। কবি নজরুল পারস্যের কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার লিখা কবিতায় হাফিজ সিরাজী, ওমর খৈয়াম এর মতো সুফিবাদী ভাবধারা প্রকাশিত হয়। যেমন-

তোমার কণ্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কণ্ঠের গান

এইটুকু শুধু রবে পরিচয়? আর সব অবসান?

অন্তরতলে অন্তরতর যে ব্যথা, লুকায়ে রয়,

গানের আড়ালে পাও নাই তার কোনোদিন পরিচয়।

সুফি সাহিত্যের এ প্রভাব আমাদের সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। বিখ্যাত সুফি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার যোগ্য অনুসারী আমীর খসরু কাওয়ালী গানের জনক। আমরা যদি মর্সিয়া সাহিত্যের দিকে তাকাই, দেখব এ সাহিত্য কর্ম পুরো বাংলায় ছড়িয়ে আছে। শেখ ফয়জুল্লাহর ‘জয়নবের চৌতিশা’ সমকালীন সময়ে সবার মুখে মুখেই ছিল। রহস্য ভেদের জন্য বাউলগণও সুফি সাহিত্যের দ্বারস্থ হন-

‘মানুষ হাওয়ায় চলে, হাওয়ায় ফিরে, হাওয়ার সনে রয়,

দেহের মাঝে আছে রে সোনার মানুষ ডাকলে কথা কয়।’

সাংস্কৃতির মাধ্যমেই জীবন বিকশিত হয়। এরই মাঝে সুফি সাহিত্য আমাদের জীবন ও সংস্কৃতিতে মিশে আছে।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ওয়াজ মাহফিল : ঐতিহ্য রক্ষায় সংস্কার জরুরি

ওয়াজ মাহফিল : ঐতিহ্য রক্ষায় সংস্কার জরুরি

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়লে পরনির্ভরশীল হবে মুসলিম সমাজ

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়লে পরনির্ভরশীল হবে মুসলিম সমাজ

বাঙালি সংস্কৃতিতে সুফি সাহিত্যের প্রভাব

বাঙালি সংস্কৃতিতে সুফি সাহিত্যের প্রভাব

বীজ থেকে বৃক্ষ সৃষ্টির বিস্ময়কর যাত্রা

সৃষ্টির বিস্ময়কর যাত্রা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম