ওয়াজ মাহফিল : ঐতিহ্য রক্ষায় সংস্কার জরুরি
মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওয়াজ মাহফিল বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা অবজ্ঞা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি এর ভেতরে প্রবেশ করা অপসংস্কৃতিকেও প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। বক্তাদের বেফাঁস মন্তব্য, দৃষ্টিকটু অঙ্গভঙ্গি, ফেরকাবাজি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট অপব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের মূল রূপ ও সৌন্দর্যকে ম্লান করছে। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক প্রচার এবং সুস্থ, সহনশীল সমাজ বিনির্মাণে ওয়াজ মাহফিল পরিচালনায় যুগোপযোগী সংস্কার, সামাজিক তদারকি ও বক্তাদের আত্মশুদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
ওয়াজ ইসলামি দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সূরা নাহল, আয়াত : ১২৫)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে দীর্ঘকাল ধরে ওয়াজ মাহফিল ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ, নৈতিকতার উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করতে ভূমিকা রেখে আসছে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষও এসব মাহফিলের মাধ্যমে ইমান-আকিদা, নামাজ-রোজা, সততা, সত্যবাদিতা ও পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে ওয়াজের প্রচার এবং বক্তাদের উপস্থাপনাশৈলীতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার পরিবর্তে বিনোদনধর্মী উপাখ্যান, অযাচিত হাস্যরস, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য ও নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে মাহফিলের ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
মাহফিলের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব
বক্তাদের বিতর্কিত আচরণের বাইরেও ওয়াজ মাহফিলের সামাজিক ইতিবাচকতা অনস্বীকার্য। মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, দুর্নীতি ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বক্তাদের বক্তব্য অনেক মানুষকে সচেতন করে। ধর্মীয় অনুশাসন পালনে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগ, পারস্পরিক সৌহার্দ ও মেলবন্ধন দৃঢ় করতেও এসব মাহফিল ভূমিকা রাখে।
কিন্তু কিছু নেতিবাচক প্রবণতা এ ইতিবাচকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অতিরিক্ত চিৎকার, শারীরিক কসরত এবং কমেডিয়ানদের মতো অঙ্গভঙ্গি ধর্মীয় আলোচনার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। ভিন্ন মতাবলম্বী, মাজহাব ও ফেরকার অনুসারীদের নিয়ে কটূক্তি এবং আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের ফলে ধর্মীয় সহনশীলতা নষ্ট হচ্ছে। বিশেষত কোনো মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে যুক্তি ও শালীনতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াই দুর্বল বা জাল হাদিস, অলৌকিক কেচ্ছা-কাহিনি এবং অবৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচার। এতে সাধারণ শ্রোতারা বিভ্রান্ত হন। ধর্মীয় বক্তব্যের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার আগে তার যথার্থতা যাচাই করা বক্তাদের দায়িত্ব।
নারী প্রসঙ্গেও দায়িত্বশীল আলোচনা প্রয়োজন। ইসলাম নারীকে সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। অথচ কখনো কখনো নারীর অধিকার ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে কটূক্তি, অবমাননাকর উপমা ও একপেশে বক্তব্য শোনা যায়। এতে নারীর প্রতি ইসলামের ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান আধুনিক সমাজের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় না। বরং ইসলামের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বক্তাদের বেফাঁস মন্তব্য ও দৃষ্টিকটু অঙ্গভঙ্গির খণ্ডিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে ট্রোল ও মিম তৈরির ঘটনাও দেখা যায়। এর ফলে বক্তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পাশাপাশি ধর্মীয় আলোচনার মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় ইসলামের উদার, মানবিক ও শান্তির বাণীর পরিবর্তে একটি অনুদার ও আক্রমণাত্মক চিত্র জনসমক্ষে উঠে আসে।
ওয়াজের মঞ্চে রাজনীতির অনুপ্রবেশ
ওয়াজ মাহফিলের অন্যতম উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ। ধর্মীয় বক্তব্যের আড়ালে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া, প্রতিপক্ষকে ইসলামের শত্রু আখ্যা দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে কাউকে কাফের বা ধর্মদ্রোহী বলার প্রবণতা সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
একটি বহু-ধর্মীয় ও বহুমতের সমাজে অন্য ধর্ম, দর্শন ও রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া আক্রমণাত্মক মন্তব্য সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ওয়াজ মাহফিলের মূল লক্ষ্য মানুষের ইহকালীন নৈতিকতা ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখানো। সেখানে দলীয় কাদা-ছোড়াছুড়ি স্থান পেলে মাহফিল তার আধ্যাত্মিক পরিবেশ হারিয়ে সাধারণ রাজনৈতিক জনসভায় পরিণত হয়। আমাদের দেশে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ওয়াজের মঞ্চ ব্যবহারের প্রবণতাও এ সংকটকে আরও জটিল করেছে। ধর্মীয় বাণীর খণ্ডিত বা পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সংস্কার ও উত্তরণের পথ
ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্য রক্ষা এবং নেতিবাচকতা দূর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বক্তাদের যোগ্যতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। কুরআন-হাদিস, তাফসির ও ইসলামি শাস্ত্রে দক্ষতার পাশাপাশি সমসাময়িক সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বক্তাদের বাচনভঙ্গি, বক্তব্য উপস্থাপন এবং গণমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে তারা বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আরও সচেতন হবেন। তৃতীয়ত, মাহফিল আয়োজক কমিটিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু জনপ্রিয়তা, বক্তার চাহিদা কিংবা ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা না করে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার অধিকারী বক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত। চতুর্থত, আলেম সমাজের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক, মানহানিকর ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য নিরুৎসাহিত করা সম্ভব। এ নীতিমালার আলোকে যোগ্য ও দায়িত্বশীল বক্তাদের তালিকা তৈরি এবং মাহফিল আয়োজকদের জন্য তা অনুসরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক তদারকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তবে সংস্কারের নামে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকুচিত করা কিংবা ওয়াজের মঞ্চকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অধীন করে ফেলা সমাধান নয়। বরং আলেম সমাজের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক জবাবদিহি এবং আইনসম্মত তদারকির সমন্বয় প্রয়োজন। ধর্মীয় বক্তব্যের স্বাধীনতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি অন্যের সম্মান, সামাজিক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে।
ওয়াজ মাহফিল শুধু একটি ধর্মীয় জমায়েত নয়; এটি সমাজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের শক্তিশালী মাধ্যম। বক্তাদের মুখের ভাষা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি শ্রোতাদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সাময়িক জনপ্রিয়তা কিংবা ভিউ পাওয়ার লোভ পরিহার করে বক্তাদের আরও সংযত, মার্জিত ও প্রাজ্ঞ হতে হবে। একইসঙ্গে ওয়াজের মঞ্চকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশংসা বা সমালোচনার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো জনকল্যাণমূলক বিষয়ে নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। গঠনমূলক, তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমেই ওয়াজ মাহফিলের প্রকৃত সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক : মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া, সিরাজনগর, কেরানীগঞ্জ।
