প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়লে পরনির্ভরশীল হবে মুসলিম সমাজ
আহনাফ আবদুল কাদির
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবহিত। (সূরা মুজাদালাহ, আয়াত : ১১)। জ্ঞান শুধু উন্নতির উপায় নয়, ক্ষমতারও উৎস। যে জাতি জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যত বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে, সে জাতি বিশ্বব্যবস্থায় ততবেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অন্যের তৈরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর যারা যতবেশি নির্ভরশীল তারা ততবেশি সে জাতির কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উত্থান এ পরনির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এটি পরাধীনতা ও ঔপনিবেশিকতায় রূপ নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখে মুসলিম দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ভারতের কেরালায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এআইসহ উদীয়মান প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়লে মুসলিম সমাজ বাইরের প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তার ভাষায়, ‘জ্ঞান ছাড়া আমরা ব্যর্থ হব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা না বুঝলে আমরা উপনিবেশিত হয়ে পড়ব।’
একসময় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ভূখণ্ড দখল, সম্পদ লুণ্ঠন ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে অন্য জাতিকে পরাধীন করে রাখত। কিন্তু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এখন আর সরাসরি ভূখণ্ড দখল অপরিহার্য নয়। কোনো ভূখণ্ডের তথ্য, জ্ঞান, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। ফলে ডিজিটাল উপনিবেশবাদের শঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে শক্তি প্রযুক্তি তৈরি করে, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে এবং অ্যালগরিদমের কার্যক্রম নির্ধারণ করে, সেই শক্তি মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছানোর মাধ্যমকেও প্রভাবিত করে তুলতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক ও এর কার্যক্রম নতুন মেরুকরণের দিকে ধাবিত করতে পারে। এমন কিছু চাপিয়ে দিতে পারে যা মানুষের নৈতিকতাবোধকে বিপর্যয়ে দিকে ঠেলে দেয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চাপিয়ে দিয়ে মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে নিতে পারে।
এআইয়ের প্রশিক্ষণ-উপাত্তে কোনো ভাষা, সংস্কৃতি বা জ্ঞানধারার প্রতিনিধিত্ব কম থাকলে সেই সমাজের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। আবার প্রযুক্তির উত্তরকে নিরপেক্ষ ও নির্ভুল ধরে নিলে এর অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাতও অধরা থেকে যায়। মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে ইসলামি জ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। আরও গভীর সমস্যা হলো, মুসলিম দেশগুলোর তথ্য ও জ্ঞান ব্যবহৃত হলেও যদি প্রযুক্তির মালিকানা, মুনাফা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অন্যের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে তারা প্রযুক্তির ভোক্তা হয়েই থাকবে, নির্মাতা বা নীতিনির্ধারক হয়ে উঠতে পারবে না।
এ বাস্তবতায় মুসলিম সমাজের জন্য প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে তা বোঝা ও নিয়ন্ত্রণে অংশ নেওয়া বেশি জরুরি। আনোয়ার ইব্রাহিম ধর্মীয় আলেমদের আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তর সম্পর্কে জানার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রযুক্তি যখন মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করছে, তখন আলেমদেরও এর কার্যপ্রণালি ও নৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রিয় নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ’ (ইবনে মাজাহ)। সময়ের দাবি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনও তাই গুরুত্বপূর্ণ। আলেম, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন প্রযুক্তিচর্চা গড়ে তুলতে হবে, যা জ্ঞানের প্রসার ঘটাবে এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকবে।
ডিজিটাল উপনিবেশবাদের ঝুঁকি মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোকে শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই চলবে না। বরং নিজস্ব গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি নির্মাণেও সক্ষম হতে হবে। বাংলা, আরবি ও অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাষায় মানসম্মত উপাত্তভান্ডার তৈরি, স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এআই ব্যবস্থা উন্নয়ন, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত যাচাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের অর্থ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মধ্যেও নিজেদের প্রয়োজন ও মূল্যবোধ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে মুসলিম উম্মাহকে অবশ্যই প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে শক্তিশালী প্রযুক্তি বলয় গড়ে তুলতে হবে। আমরা যদি যাচাই-বাছাই ছাড়া অন্যদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে থাকি এবং প্রযুক্তির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হই তবে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে আমাদের কেউই রক্ষা করতে পারবে না। তাই আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় নতুন উপনিবেশবাদের মোকাবিলা করতে হলে মুসলিম সমাজকে জ্ঞানের উৎপাদক, প্রযুক্তির নির্মাতা এবং নীতিনির্ধারণে সক্রিয় অংশীদার হতে হবে।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
akpatwary.qp-gmail.com
