বরিশালের ৫ নির্বাচনি আসন
চরমোনাই না থাকায় হেরেছে জামায়াত
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নির্বাচনি ঐক্য থেকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন সরে যাওয়ায় বরিশাল বিভাগের ৫টি আসনে হেরেছে জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া আরও অন্তত ৬টিতে জয়ের একদম কাছে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল এই দুই দলের ঐক্য থাকলে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে মিলেছে এ তথ্য। বিষয়টি নিয়ে বরিশালে এখন চলছে নানা আলোচনা। দুপক্ষের অনৈক্যের কারণেই বরিশাল বিভাগে জামায়াতের ‘এত বড় ভরাডুবি’ বলছেন সবাই। সেই সঙ্গে ঐক্যে না থাকার খেসারত দিতে হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনকেও। সারা দেশে মাত্র একটি আসনে জিতেছে এই দলের প্রার্থী। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি পর্যন্ত হেরেছেন ভোটে। অথচ জামায়াতের সঙ্গে থাকলে শুধু বরিশাল অঞ্চলেই কমপক্ষে ৪ জন সংসদ-সদস্য পেত হাতপাখা প্রতীকের এই দলটি।
বরিশাল বিভাগের ২১টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জিতেছে বিএনপি তথা বিএনপি সমর্থিত দলের প্রার্থীরা। দুটি আসনে জিতেছে জামায়াতে ইসলামী এবং একটিতে ইসলামী আন্দোলন। অথচ নির্বাচনের আগে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দল মিলে যে ঐক্য হয়েছিল তা টিকে থাকলে আমূল বদলে যেত ফলাফলের এই পরিসংখ্যান। সেক্ষেত্রে শুধু বরিশাল বিভাগেই এই দুদলের ঘরে যেত কম করে হলেও ৮-১০টি আসন। আরও অন্তত ৬টি আসনে ধানের শীষের সঙ্গে তাদের জয়-পরাজয়ের ব্যবধান থাকত মাত্র ৩ থেকে ৫ হাজার ভোট।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে জয়ী হওয়া বিএনপির প্রার্থী অ্যাড. জয়নাল আবেদিন এবার জিতেছেন ৭৮ হাজার ১৩১ ভোটে। এই আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ৫৭ হাজার ১৪৯ ভোট পেয়ে হয়েছেন দ্বিতীয়। এখানে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ২১ হাজার ৭২৪ ভোট। ঐক্য থাকলে এখানে এই দুই প্রার্থীর মিলিত ভোটের সংখ্যা হতো ৭৮ হাজার ৮৭৩। সেক্ষেত্রে পরাজিত হতো বিএনপির প্রার্থী।
নির্বাচনি ঐক্য ভাঙার এই খেসারত জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনকে দিতে হয়েছে বরিশালের আরও কয়েকটি আসনে। বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান নির্বাচিত হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে। এখানে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দুই প্রার্থীর মিলিত ভোটের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৬২৮। জোট থাকলে এখানেও হারত বিএনপি। একইভাবে বরগুনা-২ (বামনা-পাথরঘাটা-বেতাগী) আসনে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লার মিলিত ভোটের সংখ্যা যেখানে ১ লাখ ১ হাজার ৭১০, সেখানে বিএনপির নুরুল ইসলাম মনি জিতেছেন ৯০ হাজার ৬৪৩ ভোটে। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনটি এনসিপির ড. শামিম হামিদিকে ছেড়ে দেয় জামায়াতে ইসলামী। এখানে শাপলা কলি প্রতীকে হামিদি এবং হাতপাখার প্রার্থী সাবেক এমপি রুস্তুম আলী ফরাজী মিলে ভোট পান ৭১ হাজার ৮৭৯। আর বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল জিতেছেন ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোটে।
বরিশাল-৫ (সদর) আসনে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬ ভোট পেয়ে জিতেছেন বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার। এখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৮ ভোট। চরমোনাই পীর তথা ইসলামী আন্দোলনের আমিরের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। একই সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার কোনো ভোটার ভোট দেননি হাতপাখায়। নির্বাচনি ঐক্য ভাঙার পর থেকেই জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে আসছিল ইসলামী আন্দোলন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জামায়াতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য দেন চরমোনাই পীর। ধারাবাহিক এই বিষোদগারের কারণেই হাতপাখাকে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দলটির ভোটাররা। নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতপাখায় ভোট দেওয়ার দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলেও জানান জামায়াত নেতারা। ফলে নিজেদের শক্তিতেই লড়তে হয় ইসলামী আন্দোলনকে। অথচ জামায়াতের ভোট যোগ হলে এখানে জয় পাওয়া হয়তো খুব একটা কঠিন হতো না হাতপাখার প্রার্থীর জন্য।
এভাবে নিশ্চিত জয় হারিয়ে ফেলাই শুধু নয়, জামায়াত-চরমোনাই ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় বরিশালের বহু আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের পরাজয়ের ব্যবধানও বেড়েছে। অথচ ভোটের হিসাবে দাঁড়িপাল্লা আর হাতপাখার ভোট যোগ হলে সেই ব্যবধান কমে যাওয়া শুধু নয়, পরিষ্কার হয়ে উঠত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের বিষয়টি।
পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) আসনে বিএনপির আহম্মেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন জিতেছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোটে। এখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে জামায়াতের শামিম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট। এই আসনে হাতপাখার প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৯৭। এই দুজনের ভোট যোগ করলে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯৪। সেক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে তাদের পরাজয়ের ব্যবধান হতো মাত্র এক-দেড় হাজার ভোট। পিরোজপুর-২ আসনের মতো এ রকম আরও অন্তত ৫টি আসন রয়েছে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। যেসব আসনে হাতপাখা আর দাঁড়িপাল্লার ভোট যোগ হলে সম্মানজনক জয়ের জায়গায় বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীদের জন্য শিরোনাম হতো কোনোরকমে জয়।
দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বরিশাল অঞ্চলে বেশ শক্তিশালী চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। কেননা বরিশালের চরমোনাই ইউনিয়ন থেকে দলটির জন্ম। দলের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাইয়ের মরহুম পীর সাহেবের দরবারও এখানে। ফলে এখানকার প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি এলাকাতেই শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত আর জনসমর্থন রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের। বরিশাল অঞ্চলের ২১ নির্বাচনি এলাকায় জামায়াতের যে ফল বিপর্যয়, তারও প্রধান কারণ এই ইসলামী আন্দোলন। রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনি ঐক্য টিকে থাকলে এ অঞ্চলে ভালো ফলাফল করত জামায়াত-চরমোনাই ঐক্য। নির্বাচনি ফলাফলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এখানে কম করে হলেও ৮-১০টি আসন পেত তারা। কিন্তু ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় একদিকে যেমন আসন হারিয়েছে জামায়াত, তেমনি মাত্র একটি আসনে জয়ী হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনকে।
দুই আসনেই হেরেছেন মুফতি ফয়জুল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) ও ৬ (বাকেরগঞ্জ) দুটি আসনেই ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম চরমোনাই পীর। একই সঙ্গে বরিশালের ৬টি আসনেই দাপুটে জয় পেয়েছে বিএনপি। ফয়জুল করীম এ নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী হিসাবে লড়েছেন।
নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল-৫ আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ধানের শীষের প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট।
বরিশাল-৬ আসনেও ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি ফয়জুল করীম। এ আসনের মোট ১১৩টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ধানের শীষের প্রার্থী বরিশাল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট। ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৯ হাজার ১৪৬ ভোট।

