Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

অমর একুশে বইমেলা

প্রথম শিশু প্রহরে আনন্দমুখর শিশুরা

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম শিশু প্রহরে আনন্দমুখর শিশুরা

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অমর একুশে বইমেলায় শুক্রবার শিশুসহ দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো -যুগান্তর

অমর একুশে বইমেলার দ্বিতীয় দিন ও প্রথম শিশু প্রহর ছিল শিশুদের দখলে। শুক্রবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় জমায় খুদে পাঠক ও তাদের অভিভাবকরা। পাপেট শো, চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে ছোটদের বিদায় আর বড়দের আগমন। ফাল্গুনের গরম সহ্য করেই মেলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে চলেন লেখক, পাঠক ও দর্শনার্থীরা। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই স্টলে স্টলে চলে ইফতারের প্রস্তুতি, অতঃপর ইফতার। আর মেলায় আগতরা সবুজ চত্বরে বসেই সঙ্গে আনা খাবার দিয়ে শুরু করেন ইফতার। একে অন্যকে ইফতারের দাওয়াত আর ধর্মীও ভাবগাম্ভীর্য বইমেলায় ভিন্ন আবহ সংযোজন করে। ক্ষণিকের জন্য ক্রেতা-বিক্রেতারা হিসাব ভুলে সবাই সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করতে বিভোর হন শান্তিময় নীরবতায়। মেলার রীতি অনুযায়ী বিকালে মেলামঞ্চে চলে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন।

হাজারো শিশুর ক্যানভাসে শহীদ মিনার : সকাল ৯টার দিকে বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দুই পাশে ফুল ও মাঝখানে শিশুদের কলরব। শিশুদের বাহারি পোশাক ও মুক্ত বিচরণে পুরো একাডেমি প্রাঙ্গণই যেন হয়ে ওঠে ফুলের বাগান। নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ১০টায় শুরু হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার প্রাথমিক ধাপ। প্রতিযোগিতায় কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় ছিল না। শিশুরাই ঠিক করে নিল বিষয়-‘অমর একুশে’। ছোট ছোট হাতে আঁকা ক্যানভাসজুড়ে ফুটে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অবয়ব, মিনারের পেছনে রক্তিম সূর্য, সবুজ প্রান্তর আর ফুলে ভরা বেদি। কেউ এঁকেছে ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক, কেউবা লিখেছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’।

ভাষা আন্দোলনের চেতনা শিশুদের রঙ-তুলিতে যেন নতুন করে প্রাণ পায়। হাজারেরও অধিক শিশু ক্যানভাসে আঁকে নানামাত্রিক শহীদ মিনার। শ্যামলী থেকে আগত ১২ বছর বয়সি তাসমিনের সঙ্গে কথা হয়। তার ভাষ্য, এর আগে এতবড় পরিসরে কোনো প্রতিযোগিতায় সে অংশ নেয়নি। প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট, সেকেন্ড বা থার্ড না হলে মন খারাপ হবে কিনা জানতে চাইলে তার উত্তর-‘মন খারাপ হবে না’। পাশেই আরেক অভিভাবককে দেখা যায় তার সন্তানের অঙ্কনের নির্দেশনা দিতে-এভাবে নয়, ওভাবে আঁকো ইত্যাদি। এরকম ঘটনা বেশি হওয়ায় একাডেমির দৃষ্টিতে আসে। অতঃপর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম মাইকে ঘোষণা দেন, ‘শিশুদের কেউ আঁকায় নির্দেশনা দেবেন না। এটা ওদের জন্য ক্ষতি।’ ১১টার মধ্যে শেষ হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।

বাংলা একাডেমি সূত্র জানিয়েছে, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ক-শাখায় ৫৪০ জন, খ-শাখায় ৬২০ জন এবং গ-শাখায় ২৪৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।

অপু-দিপুর গল্পে ঐক্যের শিক্ষা : সূচি অনুযায়ী ১১টায় শিশু চত্বরে শিশুতোষ আয়োজন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রস্তুতি শেষ করতে সময় লাগে প্রায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত। অবশেষে আসে মাহেন্দ ক্ষণ। ক্রমেই শিশুরা জড়ো হতে থাকে পাপেট শোর মঞ্চ ঘিরে। কাকতাড়ুয়া থিয়েটার আয়োজিত পাপেট শুরু হয়-অপু ও দিপুর গল্প দিয়ে। পাপেট অপু ও দিপু শুরুতেই ঝগড়া লেগে যায়। পরে মায়ের উপদেশ-ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ‘একতাই বল’ মায়ের এই বার্তায় বদলে যায় তাদের জীবন। তারা দুই ভাই মিলে ফুলের বাগান গড়ে, বাগান রক্ষায় ঘেরা দেয়, যাতে কোনো প্রাণী এসে নষ্ট করতে না পারে। একসঙ্গে কাজের ফল-রঙিন ফুলে ভরে ওঠে চারপাশ, প্রকৃতি হয় সবুজ শ্যামল। যে মাঠে খেলায় মত্ত থাকে অপু-দিপু। তাদের বার্তা-অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার নয়; মাঠে খেলো, বই পড়ো, বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকো। বসন্তের দুপুরে তীব্র রোদে বসে হাসি-গান-সংলাপে ভরপুর পরিবেশে শিশুরা শুধু বিনোদনই পায়নি, পেয়েছে নৈতিক ও পরিবেশবান্ধব জীবনের শিক্ষা।

তবে অভিভাবকদের অনেকে আয়োজনের সার্বিক পরিবেশ দেখে খুশি হতে পারেননি। আজিমপুর থেকে দুই সন্তান নিয়ে আগত ব্যাংকার সাইফুল আমিন বলেন, বইমেলায় এমন আয়োজন শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম, ঐক্যবোধ ও পরিবেশসচেতনতার সৃষ্টি করে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন প্রখর রোদে শিশুদের মাথার উপর কিছু একটা ছাউনি না দেওয়া, ধুলাবালিমুক্ত করতে না পারাটা দুঃখজনক। কাকতালীয়ভাবে মঞ্চ থেকে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক ঘোষণা দেন, আগামী ছুটির দিনগুলোতে অর্থাৎ শুক্র ও শনিবার তারা আরও মজার মজার গল্প ও সুন্দর পরিবেশ নিয়ে হাজির হবেন। তাদের আয়োজন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শিশুরা গল্প খুব সহজে গ্রহণ করে। আমরা পাপেট শোর মাধ্যমে তাদের আনন্দ দিই। সেই আনন্দের ভেতরেই বার্তা রাখি। এই মাধ্যম দিয়ে সমাজের কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করি।’

একই সময়ে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব। এতে ক-শাখায় ২১০ জন, খ-শাখায় ২৭৯ জন এবং গ-শাখায় ৯৭ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। আবৃত্তি প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।

মেলার প্রথম শুক্রবার হিসাবে বিগত দিনে যেরকম মানুষ মেলায় এসেছিলেন, এদিন সেই পরিমাণ লোক সমাগত হয়নি। প্রকাশকরা বলছেন, মাহে রমজানে বইমেলা বেশির ভাগ লেখক-পাঠকের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ফলে রোজার ক্লান্তি নিয়ে মেলায় আসাটা কঠিন। তারপরও মানুষ মেলায় আসতে শুরু করেছে, এটা ইতিবাচক। আবিষ্কার প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, এবারের মেলায় খুব বেশি বিক্রি হবে না এটা জেনেই মেলায় এসেছি। ব্যবসা যেমন দরকার ঠিক তেমনি একুশের চেতনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সময় যাবে মানুষ অভ্যস্ত হবে। সর্বোপরি মেলা সফল হবে এই প্রত্যাশা করি।

মেলামঞ্চে ফরিদা পারভীনবিষয়ক আলোচনা : এর আগে বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করেন কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার।

মোহাম্মদ রোমেল বলেন, বাংলাদেশের সংগীতজগতে অনন্য একজন শিল্পী ফরিদা পারভীন। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে লালনের গান পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। ড. আবু ইসহাক হোসেন বলেন, ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ভর করে লালনের গান দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফরহাদ মজহার বলেন, ভাষার মাসে শিল্পী ফরিদা পারভীনকে নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। মেলায় ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন ফরহাদ মজহার।

এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি, গবেষক ও অগ্রজ সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার এবং হাসান হাফিজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী নূরুল হাসনাত জিলান, আশরাফুল হাসান (বাবু), আরিফুল হাসান ও সীমা ইসলাম। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আলম আরা মিনু, চন্দা চক্রবর্তী, ইন্দিরা রুদ্র, নাফিজা ইবনাত কবির, মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া ও পারভীন লিপি। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন শিমুল বড়ুয়া (তবলা), রাজিব আহমেদ (কী-বোর্ড) মো. মেজবাহ উদ্দিন (অক্ট্যোপ্যাড) ও পল্লব দাস (বেইজ-গিটার)।

আজকের সময়সূচি : আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রথমিক বাছাইপর্ব। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : আহমদ রফিক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইসমাইল সাদী। আলোচনায় অংশ নেবেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মনসুর মুসা। বিকাল ৪টায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .