ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে মারাত্মক পরিণতির হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের অর্থনীতিকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, তেহরানকে সহায়তা বা তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করলে সংশ্লিষ্ট দেশকে ‘মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির’ মুখোমুখি হতে হবে।
বৃহস্পতিবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে চীনের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আজ আমি কোনো দেশের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণা দিচ্ছি! যেসব দেশ তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানের জন্য কোনো ধরনের লাইফলাইন বা জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়ার সুযোগ করে দেবে, তাদের নিজেদেরই মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।’
এমন একসময় এ ঘোষণা এলো যখন সংঘাতটি ছয় মাস পূর্ণ করতে চলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় যুদ্ধের ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট চাপের মুখে আছেন।
গত মাসে ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা স্থগিত করেন। এর আগে টানা দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালেও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হয়নি। পরে খবর আসে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে আসছিল। পেন্টাগনের উপদেষ্টারা গত মাসে ট্রাম্পকে জানান, ইরানের ভেতরে হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে; এ সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সপ্তাহে বলেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বেশ কয়েক মাস ধরে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের অর্থায়নের উৎস বন্ধ করা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানের বন্দরগুলো থেকে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করছে ওয়াশিংটন।
ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত হয়েছে দেশটির অর্থনীতি। কমে গেছে তেল বিক্রির সক্ষমতাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির নেতারা এসব পদক্ষেপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছেন। শ্যাডো ট্যাংকার বা গোপন ট্যাংকারের একটি জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরান তেল রপ্তানি করে থাকে।
বুধবার এক ঘোষণায় ট্রাম্প বেশ কিছু কার্যক্রমের তালিকা তুলে ধরেন। সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। এর মধ্যে আছে তেল চোরাচালান, সোয়াপ লাইন (মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থা), নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউজ, জাহাজ নিবন্ধন ও ফ্রন্ট কোম্পানি (নামমাত্র কোম্পানি)। ট্রাম্পের ঘোষণার ভাষা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যারা ইরানের তেল কিনবে সেসব দেশের ওপর তিনি ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের কারণ হতে পারে। চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অথচ ঠিক এ সময়েই যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নতুন যেসব অর্থনৈতিক পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন, তা ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করেই করতে হবে। কিন্তু চীনের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। কারণ ইরানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য চীনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ।’
আগামী মাসে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরেরও কথা রয়েছে। ফলে বেইজিংয়ের ইরান থেকে তেল আমদানির বিষয়টিকে লক্ষ্য করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার মঙ্গলবার বলেন, সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা ইরানের সংকল্পকে ভাঙতে পারবে না।
মিডল ইস্ট আই জানায়, ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মনোযোগ সরানোর কৌশলমাত্র। এক্স-এ তিনি লেখেন, ব্যর্থ নীতিগুলোর ওপরই জোর দিয়ে চলা কেবল আরও পরাজয় এবং ইরানিদের শত্রুতাকেই ডেকে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের অংশ দাবি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড’ হিসাবে চিত্রিত করে সামাজিকমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার জবাব দিয়েছে ইরান। ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানায়, এক্সে ইরানের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র দিয়ে সেখানে ক্যালিফোর্নিয়াকে নীল রঙে চিহ্নিত করা হয়। এতে লেখা থাকে, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের নতুন ভূখণ্ড।’
তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি
হরমুজ বন্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে। সিএনবিসি নিউজ জানায়, বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিশ্ববাজারে ৯৪ দশমিক ৩১ ডলার মূল্যে বিক্রি হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
