সরেজমিন নজরুল স্মৃতিকক্ষ
অবশেষে আধুনিকায়ন হচ্ছে কেবিন নম্বর ১১৭
বিএমইউ’র প্রকৌশল শাখায় আছে সংস্কার প্রস্তাব, শিগগিরই বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
Advertisement
রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকক্ষ (কেবিন নম্বর ১১৭)। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) বি-ব্লকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কতশত রোগী প্রতিনিয়ত আনাগোনা করেন। কিন্তু অনেকে জানেনই না ওই ভবনের (প্রশাসনিক ভবন) দ্বিতীয় তলার ১১৭ নম্বর কেবিনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কেটেছে। শুধু বহিরাগত নন, বিএমইউতে চাকরি করেন এমন অনেকের সঙ্গে গত সপ্তাহে কথা বললে জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির তথ্য তারা দিতে পারেননি। কারও ভাষ্য-কবি নজরুল এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন এটা জানি কিন্তু কোনো দিন যাওয়া হয়নি।
আরেকজন বললেন, এই রুমে তো আগে স্যারেরা ধূমপান করতেন, হাসপাতালের প্রয়োজনীয় জিনিসও রাখা হতো। এমন সব মিশ্র মন্তব্য শুনে অবশেষে ১১৭ নম্বর কেবিনে যান যুগান্তরের এই প্রতিবেদক। কেবিনের লেনে প্রবেশ করার আগেই চোখে পড়ে নজরুল স্মৃতিকক্ষ সম্বলিত দিকনির্দেশনা। ১১৭ নম্বর কেবিনের দুই পাশে দেখা মেলে কক্ষটির নাম ও জাতীয় কবির বহুল পরিচিত দুটি ছবি। এই নির্দেশনার ছবি ও লেখা দেখেই বোঝা যায়, এসব উদ্যোগ খুব বেশি দিন আগের নয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩-৪ মাস আগেও কক্ষটি অবহেলায় ছিল। সম্প্রতি সমালোচনা হওয়ার পর কক্ষটি পরিষ্কার করে দর্শনার্থীদের উপযোগী করা হয়েছে।
কক্ষটির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও স্তরে স্তরে সাজানো নজরুলের নানা সময়ের ছবি, তার সম্পাদিত আলোচিত পত্রিকা ধূমকেতুর ছবি, নজরুলের বই ও নজরুলবিষয়ক সৃষ্টিকর্ম। রয়েছে একটি নজরুলের আবক্ষ ভাস্কর্য। যে বিছানায় তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সেই বিছানা ও ড্রেসিং টেবিল রয়েছে অক্ষত। বিছানার পাশে পড়ার টেবিলে রাখা হয়েছে একটি মন্তব্য খাতা। আর কক্ষটি পরিদর্শনের সময় নজরুলময় আবহ তৈরিতে সংযোজন করা হয়েছে নজরুলের গানের মিউজিক।
এখানে রাখা মন্তব্য খাতা উলটিয়ে দেখা যায়-নজরুল বিষয়ে মানুষের আগ্রহের কথা। শেরপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক বিশ্বজিৎ দাশ কক্ষটি দেখে লিখেছেন-‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত কক্ষটি পরিদর্শন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হলো।’ আরেকজন এই সীমিত স্থানে নজরুলের উল্লেখযোগ্য বই অথবা ই-বুক রাখার ব্যবস্থা করার পরামর্শও দিয়েছেন।
বিএমইউর জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত মজুমদার যুগান্তরকে জানান, সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত খোলা থাকে নজরুল কক্ষটি। অনেকেই কক্ষটি ঘুরে দেখছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন।
আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি : এসব পরামর্শ আমলে নিয়ে কক্ষটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিএমইউর রেজিস্ট্রার ডা. মোস্তফা কামাল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় কবির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। সেই জায়গা থেকে কক্ষটি অক্ষত অবস্থায় রাখা এবং আগ্রহীদের দেখানোর ব্যবস্থা রেখেছি। তবে আমাদের মাথায় এটাও রাখতে হয় যে, এখানে মানুষ চিকিৎসার জন্য আসে। ফলে এখানে খুব বেশি মানুষের আনাগোনা হলে কিছুটা সমস্যাও হয়। যারা গবেষণা করেন, নজরুল বিষয়ে যাদের ব্যাপক আগ্রহ, তাদের জন্য আমরা কক্ষটির পূর্ব আবহ অক্ষত রেখে সংস্কার করতে যাচ্ছি। শিগগিরই কাজটি সম্পন্ন হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
বিএমইউর জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত মজুমদার জানান, এখানে নজরুলের রচনাসমগ্র ও নজরুলকে নিয়ে বিশেষ গবেষণাকর্ম রাখা হবে। সেইসঙ্গে স্বাধীনতার মহান ঘোষক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ছবিসহ ঐতিহাসিক ছবিগুলো এই কক্ষে সংযোজন করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কক্ষটি আধুনিকায়নের জন্য ইতোমধ্যে প্রকৌশল শাখায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ফাইলটি সেখানে আটকে আছে। খুব দ্রুত কাজটি বাস্তবায়নের তাগাদা আছে বলে বিএমইউ সূত্রে জানা গেছে।
ধানমন্ডি ২৮ নম্বর থেকে পিজির ১১৭ নম্বরে : বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন আইপিজিএমআর বা পিজি হাসপাতাল) ১১৭ নম্বর কেবিনই ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শেষ ঠিকানা। অসুস্থ অবস্থায় জীবনের শেষ এক বছর এক মাস আট দিন এই কেবিনে কেটেছে তার। তবে অনেক বছর এই কক্ষটির খোঁজ রাখেনি কেউ। কখনো কিচেন রুম, উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষের বসার স্থান, আবার কখনো বা ধূমপান করার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এমন সব অপ্রীতিকর অবস্থার উত্তরণে নজরুল গবেষকরা অবিরাম এই কক্ষটি সংস্কার এবং নজরুলপ্রেমীদের যাতায়াতের উপযুক্ত করার দাবি জানান। এসব দাবি কখনো আলোর মুখ দেখেনি।
১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই কবিকে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০-বি নম্বর (বর্তমান নজরুল ইনস্টিটিউট) বাসা থেকে পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে কবির ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভর্তি করা হয়। এরপর দীর্ঘ এক বছর এক মাস এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ওই হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জাতীয় কবি।
মৃত্যুর তিন দশকেও জাতীয় কবির স্মৃতিরক্ষায় হাসপাতালের ওই কেবিন ও ব্যবহৃত বেড সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেননি কেউ। এমনকি কক্ষটি চিহ্নিত করে একটি স্মারকফলক বা সাইনবোর্ডও স্থাপন করেননি কেউ। শুধু তাই নয়, ১১৭ নম্বর কেবিনটি অন্যান্য কক্ষের মতোই রোগীদের জন্য নিয়মিত বরাদ্দ দেওয়া হতো। নজরুল গবেষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ২০০২ সালে কক্ষটির নামফলকসহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। এরপর সময় গড়াবার সঙ্গে কক্ষটি আবার স্টোর হাউজ হিসাবে ব্যবহার হতে থাকে। নজরুল গবেষকদের কঠোর সমালোচনার মুখে ২০১৬ সালের দিকে কিছুটা সংস্কার করা হয়। এরপর আবারও অবহেলায় পড়ে কক্ষটি। সম্প্রতি নজরুল বর্ষ উপলক্ষ্যে এটি সংস্কারে হাত দিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ। সংস্কারের আগে পরিষ্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

