Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

গাড়িচাপায় শ্রমিক হত্যার পর আপস

একটি প্রাণের মূল্য ৯ লাখ টাকা

Advertisement

মহিউদ্দিন খান রিফাত

মহিউদ্দিন খান রিফাত

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

একটি প্রাণের মূল্য ৯ লাখ টাকা

Advertisement

রাজধানীর অভিজাত বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ২৪ বছরের নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি প্রাইভেট কার ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মেহেদী হাসান। প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিল এক কিশোর। মঙ্গলবার এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে মামলা হয়। তবে কিশোরকে বাদ দিয়ে আসামি করা হয় গাড়িতে থাকা আরেকজনকে। তিনি ওই গাড়ির চালক বলে জানা গেছে। তবে পরদিনই শ্রমিকের (মেহেদী হাসান) পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপস করে ফেলে আসামিপক্ষ। আপসনামায় বলা হয়েছে, ‘দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ এবং মেহেদীর বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হলো।’ বৃহস্পতিবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ প্রাইভেট কারের চালক কিশোরকে হাজির করা হয়। এরপর আদালত তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলায় কিশোরকে আসামি করা না হলেও সমালোচনার মুখে পড়ে তাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। কিশোরটির বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন ক্যাপ্টেন বলে জানা গেছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন যুগান্তরকে আপসের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘বাদীপক্ষ প্রথমে মামলা করতে চায়নি। তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। ১০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে ৯ লাখ টাকা দিয়ে তাদের সঙ্গে আপস করা হয়েছে। তবে কিশোরকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি। পুলিশের করা সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় চালককে আসামি করা হয়েছে।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘আপসনামা অনুযায়ী নিহতের পরিবার আসামিদের জামিন বা খালাসের বিষয়ে আপত্তি করবে না। মামলার পরবর্তী শুনানি রোববার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এ হবে।’

এদিকে বিচারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘প্রাণহানি ও একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির বিপরীতে ৯ লাখ টাকার সমঝোতা খুবই অমানবিক। আর সড়ক পরিবহণ আইনের ৯৮ ও ১০৫ ধারার অপরাধ আপস-মীমাংসাযোগ্য নয়। তাই নিহতের পরিবারের সঙ্গে টাকাপয়সার বিনিময়ে সমঝোতা হলেও শুধু সেই কারণে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। তবে বাদীপক্ষ আদালতে আসামিদের জামিনে আপত্তি না জানালে কিংবা সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে অনীহা প্রকাশ করলে মামলার বিচারিক কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়তে পারে।’

তারা বলেন, ‘দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রকৃত চালককে আসামি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তদন্তে সঠিক আসামি চিহ্নিত না হলে বাদীপক্ষ আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরতে পারে এবং প্রয়োজন হলে তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আর সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে আদালতে উপস্থাপিত হলে শুধু আপসনামার কারণে আসামির দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ নেই।’

দুর্ঘটনার সময় প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিল কিশোর : দুর্ঘটনার পর গুলশান থানায় মামলা করেন মেহেদীর ভাই মোক্তাদীর ইসলাম। মামলায় গাড়িচালক হিসাবে আকাশ মারকের (৪৪) নাম উল্লেখ করা হয়। আর গাড়িতে থাকা ১৭ বছরের কিশোরকে আসামি করা হয়নি।

পরে ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার সময় কিশোরটির গাড়ি চালানোর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় বলে পুলিশসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হলে তাকে পুলিশ হেফাজতে আনা হয়। তবে কিশোরের গাড়ি চালানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার আইনজীবী আলমগীর হোসেন।

তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিও ছড়িয়েছে, সেখানে কিশোরটিকে গাড়ি চালাতে দেখা গেছে, এমনটা ঠিক নয়। ভিডিওতে গাড়ি গেট থেকে বের হওয়ার পর উলটে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিশোরটিকে গাড়ি চালাতে কেউ দেখেছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গাড়ি থেকে বের হতে দেখা যাওয়ার ভিত্তিতে তাকে চালক বলা যায় না।’

আইনজীবী আরও বলেন, ‘বিশোরটির বয়স ১৭ বছর। মামলায় যে দুই ধারায় বিষয়টি এসেছে, সেগুলোয় জরিমানার বিধান রয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৯ লাখ টাকা দিয়েছি।’

এক লাখ দাফনে, আট লাখ মা-বাবার জন্য : আপসনামায় বলা হয়েছে, নিহত মেহেদীর দাফন-কাফন ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রথম পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা দেয়। এরপর মেহেদীর বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আপসনামায় স্বাক্ষর করা হয়েছে। এতে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ১৭ বছরের কিশোর ও আকাশ মারক (৪৪)-এর জামিনে অনাপত্তি জানানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আপসনামায় আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি মেরামত কিংবা আহত চালক ও কিশোরের চিকিৎসার জন্য নিহতের পরিবারের কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে না। একই ঘটনায় ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ বা আপত্তি না তোলার বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে আইনি অবস্থান নিয়ে : সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ৯৮ ও ১০৫ ধারার অপরাধ আপসযোগ্য নয়, জামিনযোগ্যও নয়। তাই নিহতের পরিবার ৯ লাখ টাকা নিয়ে আপস করলেও শুধু এ কারণে ফৌজদারি মামলা শেষ হয়ে যাবে না। তবে টাকা যদি ক্ষতিপূরণ হিসাবে দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি আলাদা বিষয়। এখন প্রশ্ন হলো, আদালত এই আপসনামাকে মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়ায় কীভাবে দেখবেন।

মেহেদীর পরিবারের বক্তব্য মেলেনি : আপসের বিষয়ে নিহত মেহেদী হাসানের ভাই ও মামলার বাদী মোক্তাদীর ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম