ইয়েমেনে হুথিরা কি অজেয়
Advertisement
তুহিন তৌহিদ
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা নিজ দেশে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা জয় করছে। পাশাপাশি তারা প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাবে লড়াই জারি রেখেছে। হুথির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে কার্যত বিপর্যস্ত সৌদি। সেখানে বিমানবন্দর, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থায় একসঙ্গে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে-এ লড়াইয়ে জয়ী হবে কে, আর কতদিন চলবে আত্মঘাতী এ সংঘাত?
মূলত আরব দেশ ইয়েমেনে যুদ্ধ-সহিংসতা চলছে এক যুগের বেশি সময় ধরে। তবে এর শুরু আরও আগে। ২০১১ সালে কথিত ‘আরব বসন্ত’র উত্তাল ঢেউ লাগে ইয়েমেনেও। এর জেরে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগে বাধ্য হন আলী আব্দুল্লাহ সালেহ। অবসান হয় তার ৩৩ বছরের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের। পরে সালেহর স্থলাভিষিক্ত হন মনসুর হাদি। আরব বসন্ত পরবর্তী অস্থিতিশীলতার মধ্যেই নাটকীয় উত্থান ঘটে হুথিদের। তারা আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং সশস্ত্র লড়াইয়ে নামে। শুরু হয় তুমুল গৃহযুদ্ধ।
এর মাধ্যমে দুই আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও ইরান ছায়াযুদ্ধে নামে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পেছনে দাঁড়ায় সৌদি আরব। অপরদিকে হুথিদের সমর্থন জানায় ইরান। এ লড়াইয়ে হুথিদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি সরকারি বাহিনী। ২০১৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলে নেয় হুথিরা। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পালিয়ে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর এডেনে আশ্রয় নেন। হুথিরা ধীরে ধীরে লোহিত সাগরের আশপাশের অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। আল জাজিরা জানায়, ওই বছরের মার্চে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি। তারা মনসুর হাদিকে আবার ক্ষমতায় বসানো ও রাজধানী সানাকে হুথির নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিতে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে। এডেনে থাকা মনসুর হাদির সরকার সৌদিসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পায়। তখন থেকে হুথি দেশের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনী ও বাইরে সৌদির সঙ্গে লড়াই করে আসছে। কিন্তু দীর্ঘ এ লড়াইয়ে তারা পিছপা হয়নি; বরং ইয়েমেনে নতুন নতুন অঞ্চল জয় করে ক্রমাগত কোণঠাসা করে চলেছে সরকারি বাহিনীকে।
হুথিরা ইয়েমেনের ভূমিপুত্র; তারা স্বভাবে নির্ভিক ও লড়াকু। ইয়েমেন ছাড়া তাদের আর বিকল্প গন্তব্য নেই। তাই লড়াইটা অস্তিত্ব রক্ষার। দেশের জন্য জীবন দেওয়ার যে তাড়না, হুথিদের মধ্যে তা তীব্র। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলের বিমান হামলায়ও তাদের কিছু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হুথিদের লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরের বছরের ৬ মে ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে যখন হুথিদের আবার লড়াই শুরু হলো, তখন রিয়াদ সহযোগিতা চেয়েছিল ওয়াশিংটনের। মিত্রের ডাকে সাড়া দেননি ট্রাম্প। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যের যে সংগঠনগুলো সবচেয়ে বেশি সোচ্চার, হুথি তাদের অন্যতম। একাধিকবার তারা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইসরাইল ইয়েমেনের হুথির ওপর তীব্র বিমান হামলা চালায়। কিন্তু এতে তারা দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। বর্তমানে তারা যখন ইয়েমেনে নতুন এলাকা দখলের পাশাপাশি সৌদির তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে বিশ্ববাজার অস্থির করে তুলছে, তখন তাদের থামানোর জন্য নতুন করে কিছু করার সুযোগ খুবই কম। কারণ, এমন অনেক কিছুই আগে চেষ্টা করে দেখা হয়েছে। হুথিদের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সেটি হলো, তারা একটি বিশাল পার্বত্য অঞ্চলে কার্যক্রম চালায়। সেখানে তারা তাদের যোদ্ধা ও সামরিক অবকাঠামো ছড়িয়ে রাখতে পারে। সেই সঙ্গে তারা বড় ধরনের তেল অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম। জাতিসংঘ ও অন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান, লেবানন ও ইরাকে থাকা তাদের মিত্ররা হুথিদের কারিগরি জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে; আর হুথিদের কট্টর আদর্শ তাদের আরও মরিয়া করে তোলে।
নিউইয়র্কভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজ-এর গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, ‘ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আদর্শগতভাবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও সবচেয়ে আক্রমণাত্মক।’ তিনি বলেন, ‘ইরানিরা খুব দ্রুতগতিতে তাদের গড়ে তুলেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর যে সক্ষমতা অর্জন করতে ২০ বছর সময় লেগেছিল, হুথিরা তা মাত্র পাঁচ বছরেই অর্জন করে ফেলেছে।’ হুথিদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল ভান্ডার রয়েছে-যার অনেকটি ইরানের তৈরি মডেলের অনুরূপ। এগুলো দিয়ে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশ-এমনকি ইসরাইলেও আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানোর জন্য তারা অত্যাধুনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-ড্রোন ব্যবহার করেছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সাল নাগাদ হুথিরা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার যোদ্ধা নিয়োগ দিয়েছে। ২০১৫ সালে তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার।
হুথিরা তুলনামূলকভাবে সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। যদিও ধারণা করা হয়-ইরান তাদের কাছে গাইডেন্স সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। তবুও হুথিরা তাদের অনেক অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করতে সক্ষম। এমনকি এমন ইঙ্গিতও রয়েছে, তারা আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে।
লোহিত সাগর ঘেঁষা পাহাড় ও সমতল অঞ্চলে হুথির অবস্থান। এলাকাটি অপেক্ষাকৃত উর্বর। সেখানে বৃষ্টিপাত ও চাষাবাদ হয়। ফলে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় লোকজনের বসবাসও বেশি। বর্তমানে তাইজ শহর দখলে দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক লড়াই চলছে। এটি জনসংখ্যার দিক থেকে ইয়েমেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এটি হাতছাড়া হলে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়বে সৌদি সমর্থিত বাহিনী। শহরটি দখলে চলতি সপ্তাহে ব্যাপক লড়াই চলছে।
১০ সেপ্টেম্বর লোহিত সাগরের তীরবর্তী বাব আল মান্দেব প্রণালির কাছে মোচা বন্দর ও পেরিম দ্বীপের দখল নেয় হুথিরা। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়েছে। এ অবস্থায় পুরো ইয়েমেনের, অথবা বড় অংশটি হুথির দখলেই থেকে যেতে পারে। সৌদি ও হুথিকে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান খুঁজে বের করতে বলেছে ইরান। তারা মধ্যস্থতা করার প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু এ আলোচনা কি আদৌ হবে?
