ঋণের অর্থে কেনাকাটায় স্বচ্ছতা বাড়াতে উদ্যোগ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ অর্থে সরকারি দরপত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিরীক্ষার উন্নয়ন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রাথমিক প্রস্তাবে সংস্কারের ফলে কতটা অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে, অনিয়মের ঝুঁকি কতটা কমবে কিংবা নিরীক্ষার সক্ষমতা কতটা বাড়বে, তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য স্পষ্ট করা হয়নি।
‘প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড এনহ্যান্সড রিফর্মস ফর ফিন্যান্সিয়াল ওভারসাইট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ম্যানেজমেন্ট (পারফর্ম)’ নামের কর্মসূচিটি ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করে সোমবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে এডিবির কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটি ডলার নীতিনির্ভর ঋণ এবং বাকি ৫ কোটি ডলার প্রকল্প ঋণ হিসাবে নেওয়া হবে। নীতিনির্ভর ঋণের অর্থ ব্যয় হবে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে। আর প্রকল্প ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হবে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা উন্নয়নে।
২০২৯ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের উপকর্মসূচির জন্য আরও ১০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য অর্থায়নের কথাও প্রস্তাবে রয়েছে। তবে এ অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত নয়। প্রথম পর্যায়ের ঋণও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। প্রকল্প প্রস্তুতি, কারিগরি নকশা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরিতে প্রায় ৫ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তার প্রস্তাবও রয়েছে।
আধুনিক হবে ই-জিপি ব্যবস্থা : সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কারে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থা আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলো পণ্য, কাজ ও সেবা কেনার দরপত্রে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করে। বড় নির্মাণকাজ, আন্তর্জাতিক কেনাকাটা এবং একাধিক প্যাকেজের দরপত্র পরিচালনার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হবে। দরপত্রের শর্ত ও বিধিবিধান মানা হচ্ছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থাও উন্নত করার প্রস্তাব রয়েছে।
পাশাপাশি দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং কেনাকাটার তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। সাইবার নিরাপত্তা ও দুর্যোগের সময় তথ্য সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি কেনাকাটায় নারী উদ্যোক্তা এবং ক্ষদ্র্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হিসাব-নিরীক্ষা ও দুদকে সংস্কার : সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ও ব্যয়ের পূর্বাভাস এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত হিসাব ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার এবং ব্যয়ের বিপরীতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও উন্নত করা হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, জাতীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ কৌশল বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সততা ও বিধিপালন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগও রয়েছে।
অর্থ বিভাগ কর্মসূচিটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে। এতে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ), হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দুদককে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কোন সংস্কার বাস্তবায়ন করবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সুফল পরিমাপের লক্ষ্য অস্পষ্ট : স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য থাকলেও প্রাথমিক প্রস্তাবে খাতভিত্তিক ব্যয়ের বিস্তারিত বিভাজন নেই। সংস্কারের পর সরকারি কেনাকাটায় কত সময় সাশ্রয় হবে, অনিয়মের ঝুঁকি কতটা কমবে কিংবা নিরীক্ষার সক্ষমতা কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যও স্পষ্ট করা হয়নি।
ফলে ঋণের অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কী সুফল পাওয়া যাবে, তা মূল্যায়নে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও ফলাফল পরিমাপের সূচক নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রস্তাবে ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার কৌশলের সঙ্গে কর্মসূচিটির সামঞ্জস্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তায় চলমান সংস্কার উদ্যোগের পরিপূরক হিসাবেও এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনে প্রাথমিক প্রস্তাব পাঠানো মানেই ঋণ বা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। পরবর্তী মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন, ব্যয়ের কাঠামো এবং কর্মসূচির পরিধিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
