মাসিক শুরু হওয়ার পূর্বে স্বাস্থ্য জটিলতা
ডা. নাজমা আক্তার
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাসিক শুরু হওয়ার ঠিক আগের ৭ থেকে ১০ দিন ধরে খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত উদ্বেগ, আবেগের ওঠানামা, বিষণ্নতা, শরীর ফুলে যাওয়া (Edema), স্তনে ব্যথা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যাগুলোকে একত্রে প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম বা সংক্ষেপে পিএমএস (PMS) বলা হয়। সাধারণত মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এ উপসর্গগুলো কমে যায় বা শেষ হয়ে যায়। রোগীদের নিজেদের করা দৈনন্দিন উপসর্গের রেকর্ড বা ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত এ রোগ নির্ণয় করা হয়। এর চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক, যার মধ্যে খাদ্যতালিকা নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ এবং কাউন্সেলিং অন্তর্ভুক্ত। তবে পিএমএসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
* ঝুঁকির কারণ
প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমন কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো-
▶ বিষণ্নতা বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির ইতিহাস (যেমন-পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার)।
▶ পরিবারে পিএমএসের ইতিহাস।
▶ পরিবারে বিষণ্নতার ইতিহাস।
▶ পারিবারিক সহিংসতা।
▶ মাদকাসক্তি।
▶ শারীরিক ট্রমা বা আঘাত।
▶ মানসিক ট্রমা বা মানসিক আঘাত।
* সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা
▶ ডিসমেনোরিয়া বা তীব্র মাসিক ব্যথা।
▶ মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার।
▶ সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (Seasonal affective disorder)।
▶ জেনারেলাইজড অ্যানজাইটি ডিসঅর্ডার।
▶ সিজোফ্রেনিয়া।
* পিএমএসের লক্ষণ ও উপসর্গ
একজন নারীর মাসিক চক্র সাধারণত ২৮ দিনের হয়। চক্রের ১৪তম দিনে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গমন বা ওভুলেশন (Ouvlation) ঘটে এবং ২৮তম দিনে মাসিক বা রক্তপাত শুরু হয়। পিএমএসের লক্ষণগুলো সাধারণত ১৪তম দিনের কাছাকাছি সময় থেকে শুরু হতে পারে এবং মাসিক শুরু হওয়ার পর সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
আমেরিকান ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ নারী এক বা একাধিক উপসর্গ অনুভব করেন যা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না।
পিএমএসের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
▶ পেটে গ্যাস বা পেট ফাঁপা (Abdominal bloating)।
▶ পেটে ব্যথা।
▶ স্তনে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা।
▶ ব্রণ বা ত্বকের সমস্যা।
▶ মিষ্টি খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ।
▶ কোষ্ঠকাঠিন্য।
▶ ডায়রিয়া।
▶ মাথাব্যথা।
▶ আলো বা শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা।
▶ চরম ক্লান্তি।
▶ খিটখিটে মেজাজ।
▶ ঘুমের ধরনে পরিবর্তন।
▶ অতিরিক্ত উদ্বেগ।
▶ বিষণ্নতা।
▶ অতিরিক্ত মন খারাপ বা বিষাদাচ্ছন্নতা।
▶ আবেগের বিস্ফোরণ (Emotional outbursts)।
* প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (PMDD)।
কিছু নারীর ক্ষেত্রে পিএমএসের লক্ষণগুলো অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে, যা নিয়মিতভাবে মাসিক চক্রের দ্বিতীয় অর্ধে দেখা দেয় এবং মাসিক শুরু হলে বা তার ঠিক পরই শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থাকে পিএমডিডি বলা হয়। এতে রোগীর মেজাজ মারাত্মকভাবে বিষণ্ন থাকে এবং উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ ও আবেগীয় অস্থিরতা তীব্রভাবে প্রকাশ পায়। আত্মহত্যার চিন্তাও মনে আসতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
সাধারণ পিএমএসের তুলনায় পিএমডিডি এতটাই তীব্র হয় যে তা দৈনন্দিন কাজকর্মে বা সামগ্রিক কার্যক্ষমতায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। এটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং প্রায় ক্ষেত্রেই রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করা হয় না।
* কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
শারীরিক ব্যথা, মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তন এবং অন্যান্য উপসর্গ যখন আপনার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে অথবা উপসর্গগুলো না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সঠিক সময়ে এবং সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলো যেমন-রক্তশূন্যতা (Anemia), এন্ডোমেট্রিওসিস, থাইরয়েড রোগ, ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (IBS), ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম কিংবা বাতজনিত রোগ বাতিল করে নিশ্চিত হন। পিএমএস নির্ণয়ের জন্য আপনার উপসর্গগুলো মাসিক এবং ওভুলেশনের মাঝের সময়ে অনুপস্থিত থাকে কি না তা দেখা হয়।
আপনার উপসর্গগুলো পিএমএসের কারণে নাকি অন্য কোনো সমস্যার কারণে তা নির্ধারণ করতে চিকিৎসক পরিবারে বিষণ্নতা বা মুড ডিসঅর্ডারের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন। আইবিএস,হাইপোথাইরয়েডিজম এবং গর্ভাবস্থার মতো কিছু অবস্থার লক্ষণ পিএমএসের সঙ্গে মিলে যায়। থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করতে থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা, প্রেগন্যান্সি টেস্ট এবং স্ত্রীরোগসংক্রান্ত সমস্যার জন্য পেলভিক পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
আপনার পিএমএস আছে কি না তা নিশ্চিত করার আরেকটি উপায় হলো একটি ডায়রি বা ক্যালেন্ডারে প্রতি মাসে আপনার উপসর্গ ও মাসিক নিয়মিত ট্র্যাক করা। প্রতি মাসে যদি একই সময়ে আপনার উপসর্গগুলো শুরু হয়, তবে এটি পিএমএস হওয়ার জোরালো আশঙ্কা থাকে।
* পিএমএসের লক্ষণ প্রশমিত করার উপায়
পিএমএস পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব না হলেও এর উপসর্গগুলো সহজ করার জন্য আপনি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন। মৃদু বা মাঝারি ধরনের পিএমএস হলে নিচের উপায়গুলো সহায়ক হতে পারে-
▶ পেটের ফোলাভাব বা ব্লোটিং কমাতে প্রচুর তরল ও পানি পান করুন।
▶ সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও শক্তির মাত্রা উন্নত করতে সুষম খাবার খান; যার মধ্যে প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি থাকবে এবং চিনি, লবণ, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলের পরিমাণ কমাতে হবে।
▶ ক্র্যাম্প এবং মুড সুইং কমাতে ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-৬, ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।
▶ উপসর্গ কমাতে ভিটামিন ডি গ্রহণ করুন।
▶ ক্লান্তি কমাতে প্রতি রাতে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমান।
▶ পেট ফাঁপা কমাতে এবং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
▶ ব্যায়াম করা কিংবা বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমান।
▶ কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) গ্রহণ করুন, যা এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
