Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব : অস্তিত্বের রক্ষাকবচ

Advertisement

Icon

শায়রুল কবির খান

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব : অস্তিত্বের রক্ষাকবচ

Advertisement

২৬ মার্চ আমাদের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস। আরও নির্ভুলভাবে বলতে গেলে, আমরা স্বাধীন বাংলার ৫৪তম বর্ষপূর্তিতে পা দিয়েছি। স্বাধীনতার তাত্ত্বিক সংজ্ঞা নিয়ে তর্ক করার সুযোগ থাকলেও এর গুরুত্ব বা তাৎপর্য নিয়ে কোনো দ্বিমতের সুযোগ নেই। তবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব; এ দুটি শব্দ প্রায়ই একে অপরের পরিপূরক হিসাবে ব্যবহৃত হলেও এদের সংজ্ঞা ও তাৎপর্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, স্বাধীনতা হলো কোনো ব্যক্তি বা দেশের অন্য কারও অধীনে না থাকা বা পরনির্ভরশীলহীনতা। এটি একটি দেশ বা জাতির নিজ ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো কাজ করার বা মতামত প্রকাশ করার সক্ষমতা। অন্যদিকে, সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত ও অসীম ক্ষমতা। এ ক্ষমতার মাধ্যমেই রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে দেশের সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর তার কর্তৃত্ব বজায় রাখে এবং বহিঃশক্তির কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেকে মুক্ত রাখে। সার্বভৌমত্বই হলো রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা একটি দেশের আইন প্রণয়ন, শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা ও বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার নিশ্চিত করে।

পিতা ও পুত্রের মধ্যকার সম্পর্ক দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারণাটি খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। পিতার কাছে পুত্র স্বাধীন হলেও পিতা হলো সার্বভৌম। অর্থাৎ, পুত্র নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারলেও মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে পিতার হাতেই। একইভাবে, একটি দেশ স্বাধীন হলেও তার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর নির্ভর করে।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে একটিমাত্র রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক খেলার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবেও এ দেশটির অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সঠিক উপলব্ধিটা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীরউত্তম। তিনি প্রায়শই বলতেন, উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মধ্যখানে অবস্থিত এই ছোট্ট, সুজলা-সুফলা ও উর্বর ভূমির বাংলাদেশের শক্তি ও সামর্থ্য অনেক। এই বিশাল সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে, প্রতি ইঞ্চি ভূমিকে সঠিক ও ফলপ্রসূ ব্যবহার করতে হবে। তিনি কেবল কথাই বলতেন না, তার এই আদর্শ অনুযায়ী কাজও করেছেন। তিনি জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন এবং পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প তথা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের উজানে ফারাক্কার মরণবাঁধের কারণে সৃষ্ট পানির সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি জাতিসংঘে ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানির প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন এবং পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, সেচ কাজে পানির চাহিদা মেটানো এবং পুকুরে পানি সংরক্ষণের জন্য নানাবিধ সুবিধা নিশ্চিতে খাল খনন কর্মসূচির প্রবর্তন করেছিলেন।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক গঠন। সার্ক গঠন করে তিনি এ অঞ্চলের জন্য একটি স্থায়ী রক্ষাকবচ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সার্কের প্রয়োজনীয়তা কোনো একটি দেশের বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসাবে দেখার সামান্য সুযোগ নেই। পরস্পর পরস্পরের স্বার্থ দেখতে হবে অনিবার্যভাবে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন ঢাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও অনুধাবন করা অপরিহার্য। সেই দিনই আমরা প্রথম মুক্তির স্বাদ পাই এবং নিজেদের স্বাধীন ভাবতে শুরু করি। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এই গভীর উপলব্ধিটা জাতি রাষ্ট্রের ভিত্তিতে শুরু হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেওয়া রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দর্শনের মাধ্যমে।

২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবসটির প্রতীকী ও আবেগপ্রবণ গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৭১ সালে প্রবাসে যে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার কাঠামোগত ভিত্তিটা রচিত হয়েছিল চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যখন তৎকালীন বিদ্রোহী বাঙালি সামরিক অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীন ঘোষণা দিয়েছেন। বহিঃবিশ্বের সাহায্য চেয়ে জনগণকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। তিনি নিজে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে এবং সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান।

স্বাধীনতা দিবস আমাদের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা একদিন পরাধীন ছিলাম। পরাধীন না থাকলে স্বাধীনতা দিবসের কোনো দরকার হয় না। আমাদের দরকার ছিল। এর আগে আমাদের স্বাধীনতা দিবস ছিল ১৪ আগস্ট, যেদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আমরা স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের অংশ হয়েছিলাম।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রিতায় লিখেছেন ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে। এই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন কিভাবে বাংলাদেশ জন্ম নেওয়া তার স্বপ্নের কথা। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম আমরা, যাতে আরও ভালো থাকতে পারি, আমাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারি, সে জন্যই তো স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। আমরা একটা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছি। আমরা এই যুদ্ধকে বলি মুক্তিযুদ্ধ। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ছাড়া দেশের সবাই এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এই স্বাধীনতার জন্য লাখ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছিল। তারা কেউ স্বাধীনতার ফল ভোগ করে যাননি। আমরা যেন তাদের কথা ভুলে না যাই।

আমাদের ভাগ্য আমরা গড়ব, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা নেব, এ জন্যই স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এবং অকাতরে সম্পদ, সম্ভ্রম ও প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলাম। এক্ষেত্রে আমাদের কতটুকু অর্জন ও কতটুকু ঘাটতি, তা খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে আমরা আসলে কতটা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে চলেছি। আমরা যদি সমষ্টিগতভাবে আগের চেয়ে ভালো থাকি, তাহলেই বলতে হবে যে আমরা স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছি।

শায়রুল কবির খান : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে জেন-জি’দের বিশেষ শুভেচ্ছা বিজয়ের

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে জেন-জি’দের বিশেষ শুভেচ্ছা বিজয়ের

বিশ্বে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান বাড়ছে: মোদি

বিশ্বে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান বাড়ছে: মোদি

পাকিস্তানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনকালে গুলিতে হতাহত ৯৫

পাকিস্তানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনকালে গুলিতে হতাহত ৯৫

খালেদা জিয়ার পক্ষে স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন জাইমা রহমান

খালেদা জিয়ার পক্ষে স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন জাইমা রহমান

ত্রিপুরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন

ত্রিপুরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন

ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী

ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী

আরও পড়ুন

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

দৃষ্টিপাত এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম