শেখ হাসিনা কি ফিরবেন
Advertisement
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা ও কাটাছেঁড়া চলছে। এটি সফল না ব্যর্থ এ নিয়েও কথা হচ্ছে বিস্তর। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ভর করে ফলাফল লক্ষ্যের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ তার ওপর। অর্থাৎ কে কী চেয়েছিলেন, আর কী পেয়েছেন। আমরা দেখেছি, সরকারবিরোধী আন্দোলনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে।
আন্দোলনের সামনের কাতারে ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। তারা যা চেয়েছিলেন, তা পেয়েছেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার হয়েছে। এখন দেশের ৯৩ শতাংশ সরকারি চাকরি কোটামুক্ত।
রাজনৈতিক দলগুলো দেশের একটি বড় স্টেকহোল্ডার। ক্ষমতার রাজনীতিতে তারাই খেলোয়াড় এবং নিয়ামক। তারা নানাভাবে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছিলেন। অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছিল। জেঁকে বসেছিল একদলীয় অলিগার্ক। ক্ষমতাসীনদের বাইরে সব দল চেয়েছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’। তা তারা পেয়ে গেছে। সরকার বদল হয়েছে। তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমজনতা কী চেয়েছিল, আর কী পেয়েছে? সাধারণ মানুষ যে স্বস্তি, সাংঘর্ষিক রাজনীতির অবসান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক নৈরাজ্য থেকে মুক্তি চেয়েছিল, তা এখনো অধরা। অলিগার্কি বা গোষ্ঠীস্বার্থের যে বলয়, তা ভাঙার জন্য যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন এমন হয়? এবারই তো প্রথম আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। আগেও হয়েছে একাধিকবার। মানুষ যা চেয়েছিল, তা পায়নি। কেন পায়নি? আমরা কি ভুল কিছু চেয়েছি, যা আমাদের প্রাপ্য নয়? নাকি আমরা পরিবর্তনের যোগ্য নই?
অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসকরা মনে করতেন, ভারতীয়রা দেশ পরিচালনার উপযুক্ত নয়। ব্রিটিশ কর্মকর্তা লর্ড ম্যাকলে এ অঞ্চলের মানুষদের মিথ্যাবাদী, শঠ, হিংসুটে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন, যা বর্তমান বাস্তবতার নিরিখেও সত্য বলে মনে হয়। ব্রিটিশদের এ মূল্যায়নকে নিছক ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই।
আমরা গণতন্ত্রের চর্চায় বারবার হোঁচট খেয়েছি। কে না জানে, আমাদের মিথ্যাচার, লুটেরা স্বভাব, ঈর্ষা ও জিঘাংসার জুড়ি নেই। আমরা এখন পর্যন্ত সুন্দরভাবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ততা প্রমাণ করতে পারিনি। আমরা আমাদের স্বভাবের কারণে গণতন্ত্রের চর্চায় বারবার হোঁচট খেয়েছি আর অদৃশ্য শক্তির দিকে আঙুল তুলে নিজেদের দায় লুকানোর চেষ্টা করেছি। কখনো বলেছি, সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দাঁড়াতে দিচ্ছে না। কখনো বলি, আমরা ভালো কিছু করতে চাইলেও বিদেশিরা এসে ষড়যন্ত্র করে সব ওলটপালট করে দেয়। আমরা নিজেরা যেন ধোয়া তুলসীপাতা!
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান মনে করতেন, এ অঞ্চলের মানুষ প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি বলতেন, এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ অশিক্ষিত, নাদান। তারা গণতন্ত্রের প্রকৃত মর্ম বোঝে না। তারা পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের উপযুক্ত নয়। তাদের জন্য দরকার দেশজ গণতন্ত্র। এ ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনি একটি ‘নিয়ন্ত্রিত’ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যা ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে পরিচিত। আইয়ুব খানের এ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। আইয়ুব খানের এ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের মনোভাবের মধ্যে এক ধরনের মিল ছিল, যারা মনে করত, এ অঞ্চলের মানুষ দেশ শাসনের জন্য যোগ্য নয়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সমস্যাটি কাঠামোগত। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও নেতারা ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করেন, যা গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থি। ক্ষমতার এ অপব্যবহার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবই মূলত গণতন্ত্রকে বারবার অকার্যকর করে তুলছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতা ও ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন বেশ উদ্বেগজনক। নেতারা ক্ষমতা পাওয়ার পর সেটিকে ‘আল্লাহর নিয়ামত’ বা ‘বাপের সম্পত্তি’ মনে করেন।
বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্রে’ জবাবদিহির অভাব এবং নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এগুলো আলোচনা করা যাক-
এক. রাজনীতিবিদরা মনে করেন, একবার ক্ষমতায় বসলে তা আমৃত্যু ভোগ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। পরিবার থেকেই আসবে ‘নেতৃত্ব’। তাদের অনুসারীরাও এটা বিশ্বাস করে। এটি ব্যক্তি বা পরিবার পূজার সমার্থক।
দুই. সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভা পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। মন্ত্রিসভা এখানে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করে, যার ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না। রাজতন্ত্র বিদায় নিলেও বর্তমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন একচ্ছত্র রাজা।
তিন. রাজনীতি মূলত একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ অভিন্ন হওয়ার কারণে, দলবদল হলেও এ গোষ্ঠীগুলোর আচরণ বা চিন্তাধারায় কোনো পরিবর্তন আসে না; বরং তারা নিজেদের মুনাফা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতেই ব্যস্ত থাকে।
চার. সাধারণ মানুষের স্বপ্ন বা চাহিদার চেয়ে নেতার ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি।
প্রশ্ন হলো, আমরা এ চক্র থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসব? অলিগার্কি বা গোষ্ঠীস্বার্থের এ ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট একক জাদুকরী ফর্মুলা নেই। তবে কিছু মৌলিক পরিবর্তনে দরকার। যেমন, রাজনীতিতে যারা জনমত তৈরি করেন (অপিনিয়ন মেকার), তাদের মানসিকতা বা ‘খাসলত’ বদলাতে হবে। যদি মধ্যবিত্ত বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন না আসে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতার প্রবণতা নিুগামীই থাকবে।
নেতৃত্ব ও আচরণের দায়বদ্ধতা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, তা একটি গুরুতর ভাবনার বিষয়। রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার প্রতি লালসা এবং একে ‘পৈতৃক সম্পত্তি’ মনে করার মানসিকতা দূর করতে হবে। যতক্ষণ না রাজনৈতিক দলগুলো জনকল্যাণমুখী কাজকে নিজেদের ধ্যানজ্ঞান মনে না করবে, ততক্ষণ এ গোষ্ঠীস্বার্থের বলয় ভাঙা কঠিন।
ছাত্র রাজনীতির সংস্কার দরকার। প্রচলিত লাঠিয়াল বাহিনী বা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করা দরকার। ছাত্র রাজনীতির নামে এখন যা চলছে, তা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ রাজনৈতিক দলের পোষা ঠ্যাঙারে বাহিনীর দুর্বৃত্তপনা। এখানে না আছে শিক্ষাবিষয়ক কোনো ব্যাপার, না আছে রাজনীতি।
এখানে আরেকটি বিষয় ভাবায়। এদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তো কম হলো না! তারপরও নিয়মিত বিরতিতে স্বৈরাচার কেন ফিরে আসে? এ যেমন, এখন খুব আলোচনা হচ্ছে, শেখ হাসিনা ফিরে আসবেন। হাসিনার অনুসারীরা তৈরি হচ্ছেন। তারা এখন ব্যাকফুটে আছেন। পরিস্থিতি অনুকূল হলে তারা আবার জেঁকে বসবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যা যা করা হয়েছে, তার শোধ নেবেন, সব সুদেমূলে আদায় করবেন। এ হুংকার শোনা যাচ্ছে।
যে পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, সে অবস্থায় কোনো শাসকের ফিরে আসার নজির বা সম্ভাবনা সাধারণত থাকে না। আমরা ইরানের রেজা শাহ পাহলভির কথা জানি। মুসাফিরের জীবনযাপন করেই বিদেশে তাকে মরতে হয়েছে। দেশে আর ফেরা হয়নি। ফিলিপাইনের মার্কোস সেই যে পালিয়ে বিদেশে গেলেন, আর ফিরে আসতে পারেননি। বিদেশেই মারা গেছেন। তার লাশ পর্যন্ত দেশে এনে কবর দেওয়া যায়নি। এ রকম উদাহরণ আছে আরও অনেক।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত শাসক আবারও ফিরে আসবেন, এ চিন্তাটা আসে কীভাবে? আসে এজন্যই যে, মানুষ দূরবর্তী অতীত ভুলে যায় আর নিকট অতীতের কথা মনে রাখে বেশি। হাসিনা-পরবর্তী জমানায় মানুষ যদি সুখ, স্বস্তি, নিরাপত্তা আর সমৃদ্ধি না পায়, তাহলে একসময় তারা ভাবতে থাকবে-আগেই তো ভালো ছিলাম। এ রকম একটা মনোজাগতিক পরিবেশ তৈরি হলে হাসিনার ফিরে আসার পটভূমিও তৈরি হয়ে যাবে। হাসিনা ঠেকাও স্লোগান দিয়ে আর বাগাড়ম্বর করে কোনো কিছু হবে না। কাজ করে দেখাতে হবে। কাজের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে হবে, হাসিনা-পরবর্তী যুগ আগের চেয়ে ভালো।
আমাদের ইতিহাস হচ্ছে, যুগে যুগে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেগে ওঠার ও লড়াই করার। আবার এটাও ইতিহাস, আমরা বারবার প্রতারিত হয়েছি। স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের এ ধারাবাহিক ঘটনাবলি নিয়েই আমাদের ইতিহাস।
আমরা কি এ চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে ইতিহাস তৈরি করতে পারব?
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
