মৎস্যকন্যা কি সত্যিই ছিল, নাকি শুধুই মিথ?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মারমেইড বা মৎস্যকন্যা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের আগ্রহের যেন অন্ত নেই। শেক্সপিয়ারের সাহিত্য থেকে শুরু করে ডিজনির চলচ্চিত্র- বিভিন্ন মাধ্যমে মৎস্যকন্যার উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্বের নানা দেশের লোককথাতেও রয়েছে জলপরীর গল্প। কোথাও জলপরী, কোথাও মারমেইড, কোথাও মাদার অফ ওয়াটার বা জলের মা, আবার কোথাও সাইরেন নামে পরিচিত এই কাল্পনিক চরিত্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রামের পুকুরে ‘জলপরী’র দেখা মিলেছে বলে গুজব ছড়ায়। চার-পাঁচ দিন ধরে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত কৌতূহলী মানুষ পুকুরটি ঘিরে ভিড় করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও। পরে স্থানীয় প্রশাসন জানায়, পুকুরে মাছের ঝাঁকের চলাচলকে জলপরী হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সতর্ক করে মুচলেকাও নেওয়া হয়।
তবে জলপরীর অস্তিত্ব নিয়ে এমন গুজব শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রয়েছে। যদিও সমুদ্র বিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় মারমেইডকে কাল্পনিক বা পৌরাণিক চরিত্র হিসেবেই দেখা হয়েছে।
জলপরীর ধারণার শুরু কোথায়?
হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জলপরী বা মৎস্যকন্যার গল্প প্রচলিত রয়েছে। এই ধারণার সুনির্দিষ্ট উৎপত্তি কোথা থেকে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণী দেখার পর থেকেই এমন গল্পের জন্ম হতে পারে।
রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের তথ্য অনুযায়ী, মেসোপটেমীয় রূপকথায় পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার কথা পাওয়া যায়। তিনি কেলডীয় সাগরের দেবতা ইয়া বা ওয়ানেস। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সালের দিকে সিরিয়ায় আতারগাতিস নামে এক দেবীর গল্পেও মৎস্যকন্যার আদিরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি মাছের রূপ ধারণ করতে পানিতে ডুব দিলে দেবতারা তার শরীরের ওপরের অংশ মানবীর মতো এবং নিচের অংশ মাছের মতো রেখে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশান সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, মারমেইডে বিশ্বাসের উৎপত্তি আরও প্রাচীন হতে পারে। প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে শেষ প্রস্তর যুগে গুহাচিত্রে জাদুকরী নারীসদৃশ অবয়বের উপস্থিতির কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌভাগ্য নাকি অমঙ্গলের প্রতীক?
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জলপরীর অর্থও ভিন্ন। কোথাও তারা সমুদ্রের প্রাণ ও উর্বরতার প্রতীক, আবার কোথাও ধ্বংস ও বিপর্যয়ের প্রতীক। নাবিকদের লোককথায় জলপরীকে কখনো সৌভাগ্যের, কখনো অমঙ্গলের লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছে। অনেক গল্পে জলপরী ও মানুষের বিয়ের কথাও রয়েছে। এসব গল্পে জলপরীর টুপি, বেল্ট, চিরুনি বা আয়না লুকিয়ে রাখার মাধ্যমে তাকে মানুষের সঙ্গে আটকে রাখার কাহিনি প্রচলিত।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলপরীর ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। আফ্রিকায় ‘মামি ওয়াটা’, স্লাভিক সংস্কৃতিতে ‘রুসালকি’, আয়ারল্যান্ডে ‘মেরোজ’ এবং স্কটল্যান্ডে ‘সেলকি’র গল্প প্রচলিত। গ্রিক পুরাণের ‘সাইরেন’দেরও পরবর্তী সময়ে মাছের লেজযুক্ত মৎস্যকন্যার রূপে চিত্রিত করা হয়েছে।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে মৎস্যকন্যা
মৎস্যকন্যার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক চরিত্রগুলোর একটি হ্যানস ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’। ১৮৩৭ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে শিশুদের রূপকথার সংকলনের অংশ হিসেবে গল্পটি প্রকাশিত হয়। পরে এটি থিয়েটার, অপেরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ডিজনির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র মুক্তির পর ‘দ্য লিটল মারমেইড’ বিশ্বজুড়ে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রূপকথাতেও সুবর্ণমচ্ছা নামে এক জলপরীর গল্প রয়েছে। রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে হনুমানের সেতু নির্মাণের পথে বাধা দেওয়া এই জলপরী পরে হনুমানের প্রেমে পড়ে তাকে সেতু নির্মাণে সাহায্য করে। বর্তমানে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসের বিভিন্ন প্রতীকে সুবর্ণমচ্ছার উপস্থিতি দেখা যায়।

