ছোট হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিয়ের আয়োজন, চাপে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিয়ের আয়োজনের ধরন বদলে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অনেক দম্পতি বড় অনুষ্ঠানের পরিবর্তে সীমিত পরিসরে বিয়ে করছেন। অতিথির সংখ্যা কমানো, সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা।
এর প্রভাব পড়ছে বিয়েকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসায়ও। ক্যাটারিং, ফটোগ্রাফি, পোশাক ভাড়া ও অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার পেতালিং জায়ায় সম্প্রতি বিয়ে করেন ২৬ বছর বয়সি আম্মার হাজিক জুলকিফলি। বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে তিনি অতিথির তালিকা ছোট করেন। পাশাপাশি অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।
আম্মারের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির কারণে খাবার সরবরাহের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোট ব্যয় বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে এ খাত থেকে। ফলে অতিথির সংখ্যা কমিয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পেরেছেন।
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি তরুণদের জীবনযাপন ও বিয়েসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই দেরিতে বিয়ে করছেন, অতিথির সংখ্যা সীমিত রাখছেন এবং বড় আয়োজনের পরিবর্তে সঞ্চয় ধরে রাখাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৮০ হাজারে। ১১ বছর আগে দেশটিতে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখ।
ফিলিপাইনের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যেও বিয়ের সংখ্যা কমার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে নিবন্ধিত বিয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। শুধু মার্চ মাসেই এ হার ছিল ৮৩ শতাংশ। তবে এই বড় পতনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
থাইল্যান্ডেও ছোট পরিসরে বিয়ের আয়োজন জনপ্রিয় হচ্ছে। ক্রুংথাই কার্ড ও বিয়েবিষয়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাবুইওয়েডিংয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এ বছর ১৫ থেকে ৫০ জন অতিথি নিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের বিয়ের পোশাক প্রতিষ্ঠান দ্য অরোরা ওয়েডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা জাস্টিন এনজির মতে, দম্পতিরা এখন জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের চেয়ে অতিথিদের স্বাচ্ছন্দ্য ও অনুষ্ঠানে তাদের অভিজ্ঞতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সি আনাসা রিজকি কামালিনা গত ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় ধর্মীয় কার্যালয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। পরে বাড়ির উঠানে ছবি তুলে দিনটি স্মরণীয় করে রাখেন। তার বড় ভাইয়ের বিয়েতে ২০২০ সালে প্রায় দুই হাজার অতিথি উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি নিজে বেছে নিয়েছেন তুলনামূলক ছোট আয়োজন।
বছরের শেষ দিকে ৩০০ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে আনাসা ও তার সঙ্গীর। এ জন্য তাদের বাজেট ১০ কোটি ইন্দোনেশীয় রুপিয়া, যা প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার সমান।
আনাসার মতে, বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনগত ও ধর্মীয় স্বীকৃতি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ঋণ করে কিংবা নিজেদের সঞ্চয় শেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা যুক্তিসংগত নয়।
ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে দম্পতিরা বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করছেন। ফিলিপাইনে কোনো কোনো দম্পতি খাবার ও ফটোগ্রাফির খরচ মেটাতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সহায়তা নিচ্ছেন। কেউ খাবারের ব্যয় বহন করছেন, আবার কেউ ছবি তোলার সেবায় ছাড় দিচ্ছেন। থাইল্যান্ডে অনেক দম্পতি ব্যয়বহুল শুভদিনের পরিবর্তে তুলনামূলক সাশ্রয়ী তারিখে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বিয়ের আয়োজন ছোট হয়ে আসায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কৌশল পরিবর্তন করছে। আয় কমে যাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিবর্তে করপোরেট ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকছে।
তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি এক রকম নয়। পর্যটনকেন্দ্রিক বিয়ের বাজারে এখনো বড় অঙ্কের ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। বিদেশি দম্পতিদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কাজ করছে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ভিএনএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কুয়াংনিন প্রদেশে বছরের প্রথম চার মাসে ভারতের ছয়টি ধনাঢ্য পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব বিয়ের আয়োজনে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলে এবং প্রতিটির বাজেট ছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিয়ের আয়োজনের ক্ষেত্রে জাঁকজমকের পরিবর্তে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত সঞ্চয় রক্ষা ও অতিথিদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তবে সাধারণ দম্পতিদের মধ্যে ছোট আয়োজনের চাহিদা বাড়লেও বিলাসবহুল ও পর্যটননির্ভর বিয়ের বাজারে এখনো সম্ভাবনা রয়েছে।
